৩০০ বছরের ইতিহাসে মোড় বদল?
ব্রিটেনে লিখিত সংবিধানের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বার্নহ্যাম
- মেয়রদের হাতে আয়কর ও ব্যবসায়িক করের অংশ দেওয়ার পরিকল্পনা, জার্মানির মতো আঞ্চলিক সমতা মডেলের পথে ব্রিটেন

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তার দাবি, দেশের ক্ষমতা শুধু লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে কেন্দ্রীভূত না রেখে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলের নির্বাচিত মেয়রদের হাতে আরও বেশি আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা তুলে দেওয়া প্রয়োজন। আর এই বিকেন্দ্রীকরণের পথ মসৃণ করতে ব্রিটেনের একটি লিখিত সংবিধান প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তিনি।
আজ রবিবার ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বার্নহ্যাম বলেছেন, তার সরকারের ক্ষমতাবিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি দেখিয়ে দিয়েছে, ব্রিটেনের বর্তমান অলিখিত সাংবিধানিক কাঠামোতে স্থানীয় সরকারগুলোর ক্ষমতা কতটা অনিশ্চিত। তার মতে, একটি লিখিত সংবিধান আঞ্চলিক ক্ষমতা, অধিকার এবং দায়িত্বের স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করতে পারে।
‘কীভাবে দেশ চলে সেটাও বদলাতে হবে’
বার্নহ্যাম এর আগে ম্যানচেস্টারে দেওয়া একাধিক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ব্রিটেনের সমস্যা শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের নয়, বরং শাসনব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যেও রয়েছে। তার লক্ষ্য, ওয়েস্টমিনস্টার থেকে ক্ষমতা সরিয়ে স্থানীয় অঞ্চলের হাতে তুলে দেওয়া।
তিনি এই পরিকল্পনাকে বলেছেন রিউয়্যার্ড ব্রিটেন–অর্থাৎ নতুনভাবে সাজানো ব্রিটেন। তার লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়া, যাতে শুধু লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ড নয়, উত্তর ইংল্যান্ডসহ পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোও সমান সুযোগ পায়।
বার্নহ্যামের রাজনৈতিক দর্শনের মূল স্লোগান, গুড গ্রোথ ইন এভরি পোস্টকোড, অর্থাৎ ব্রিটেনের প্রতিটি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
মেয়রদের হাতে করের অংশ দেওয়ার পরিকল্পনা
বার্নহ্যামের নতুন পরিকল্পনায় ইংল্যান্ডের আঞ্চলিক মেয়রদের আরও আর্থিক স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৮ সাল থেকে কিছু অঞ্চলের মেয়ররা নিজেদের এলাকার আয়করের একটি অংশ ধরে রাখতে পারবেন। পাশাপাশি ব্যবসায়িক কর নিয়েও তাদের ভূমিকা বাড়ানো হবে।
এর ফলে স্থানীয় নেতারা পরিবহন, আবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় আরও বেশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পাবেন।
তবে এই পরিকল্পনার বিরোধিরাও রয়েছেন। তাদের প্রশ্ন, ক্ষমতা দিলেও যদি পর্যাপ্ত অর্থ না দেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় সরকারগুলো কীভাবে বড় দায়িত্ব সামলাবে?
জার্মানির মডেল থেকে অনুপ্রেরণা
বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, আঞ্চলিক সমতার ক্ষেত্রে তিনি জার্মানির মৌলিক আইনের মডেল থেকে অনুপ্রাণিত। জার্মান ব্যবস্থায় দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে আর্থিক ভারসাম্য তৈরির জন্য পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা রয়েছে।
বার্নহ্যামের যুক্তি, ব্রিটেনেও এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন যেখানে কোনো অঞ্চলের নাগরিক শুধু জন্মস্থানের কারণে কম সুযোগ পাবেন না।
ব্রিটেনের জন্য কতটা বড় পরিবর্তন?
ব্রিটেন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম পুরনো অলিখিত সংবিধানভিত্তিক রাষ্ট্র। অর্থাৎ সেখানে একটি একক লিখিত সংবিধান নেই; বরং সংসদীয় আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত, ঐতিহ্য ও সাংবিধানিক রীতির সমন্বয়ে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়।
তাই লিখিত সংবিধানের প্রস্তাব ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে সংসদের ক্ষমতা, কেন্দ্র ও অঞ্চলের সম্পর্ক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মে মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে বার্নহ্যামের পরিকল্পনা নিয়ে সতর্কতাও রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, ক্ষমতাবিকেন্দ্রীকরণ ভালো উদ্যোগ হলেও এর জন্য স্পষ্ট জবাবদিহি, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য এতটাই বেশি যে শুধু ক্ষমতা হস্তান্তর করলেই সমস্যা সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে বার্নহ্যামের পরিকল্পনা সফল হলে ব্রিটেনের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। ওয়েস্টমিনস্টারের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে অঞ্চলগুলোর হাতে ক্ষমতা দেওয়ার এই উদ্যোগকে অনেকে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
তবে এখন দেখার বিষয়, সংবিধান বদলের স্বপ্ন, নাকি শুধু ক্ষমতা ভাগের নতুন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হয়েই থেকে যাবে বার্নহ্যামের পরিকল্পনা।






