তিন বছর ধরে জেলবন্দি
গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানোর মাশুল দিচ্ছেন ইমরান খান?

ক্ষমতা হারানোর পর ইমরানের বিরুদ্ধে একশোর বেশি মামলা হয়েছে।
এক সময় ব্যাট হাতে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। এর তিন দশক পরে ভোটের মাঠে দেশের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। আজ সেই ইমরান খান তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে। একের পর এক মামলায় কিছু সাজা বাতিল হয়েছে, কিছু স্থগিত হয়েছে, তবু মুক্তি মেলেনি। চোখের চিকিৎসার জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাকে নির্দিষ্ট হাসপাতালে পাঠাতে বললেও সেই নির্দেশ ঘিরেও শুরু হয়েছে সরকার-আদালত টানাপোড়েন। এই পরিস্থিতিতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, ইমরানের বিরুদ্ধে মামলাই কি তাঁর বন্দিত্বের একমাত্র কারণ, না কি এখনও বিপুল জনসমর্থন ধরে রাখাটাই পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় অস্বস্তি?
এই প্রশ্নই তুলেছেন ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের সদস্য এবং রাজনৈতিক কলামিস্ট ড্যানিয়েল হানান। ২০ আগস্ট ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-এ প্রকাশিত একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে তার বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরানের ভুল ছিল, তার সরকারের সমালোচনারও যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। কিন্তু সেই সব ভুল দিয়ে তিন বছরের বন্দিত্ব এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে তাকে কার্যত দূরে রাখাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। হানানের মতে, অবাধ নির্বাচন ও আইনের শাসনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্যই এখন বড় মূল্য দিতে হচ্ছে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে।
হানানের এই অবস্থান নতুনও নয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে পাকিস্তান নিয়ে আলোচনায় তিনি সরাসরি বলেছিলেন, তার ধারণায় ইমরান কারাগারে রয়েছেন কারণ “অবাধ নির্বাচন হলে তিনি জিতবেন”। একই আলোচনায় ব্রিটিশ সরকারও স্বীকার করেছিল, পাকিস্তানের ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও আইনের শাসনের প্রশ্ন নিয়মিত তোলা হয়।
ক্রিকেটের মাঠ থেকে ক্ষমতার মসনদ
হানান তার লেখায় ইমরানের সঙ্গে ব্রিটেনের পুরনো সম্পর্কও সামনে এনেছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন ইমরান, সেখানকার হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন। ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেটেও ছিলেন পরিচিত মুখ। ১৯৯২ সালে তার নেতৃত্বেই পাকিস্তান প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতে।
ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং সমাজসেবায় যুক্ত হন তিনি। ১৯৯৬ সালে গড়ে তোলেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। প্রথম দিকে ভোটের রাজনীতিতে প্রায় কোনও সাফল্যই ছিল না। কিন্তু দীর্ঘ দুই দশকের লড়াইয়ে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, পুরনো রাজনৈতিক পরিবারগুলোর বিরোধিতা এবং বিশেষ করে তরুণদের সমর্থন তাঁকে পাকিস্তানের অন্যতম জনপ্রিয় নেতায় পরিণত করে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হন ইমরান। যদিও তার সেই উত্থানের পেছনে তৎকালীন সামরিক প্রতিষ্ঠানের সমর্থন ছিল বলে বিরোধীরা অভিযোগ করেছিল। ক্ষমতায় থাকাকালে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং রাজনৈতিক চাপের অভিযোগও উঠেছিল তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে। হানানও স্বীকার করেছেন, ইমরান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভুল করেছেন।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। ২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টের অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারান তিনি। তার পর থেকেই রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হতে থাকে।
মামলা একশোর বেশি
ক্ষমতা হারানোর পর ইমরানের বিরুদ্ধে একশোর বেশি মামলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রি, রাষ্ট্রীয় গোপন নথি প্রকাশ, বিয়ের বৈধতা থেকে দুর্নীতি... অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সাজা পরে বাতিল অথবা স্থগিত হয়েছে। কিন্তু আল-কাদির ট্রাস্ট-সংক্রান্ত ভূমি দুর্নীতি মামলায় ২০২৫ সালে দেওয়া ১৪ বছরের কারাদণ্ড এখনও তার বন্দিত্বের অন্যতম প্রধান আইনি ভিত্তি। ইমরান সব অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। সরকার সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
হানানের যুক্তি, মামলার সংখ্যা নয়, পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরানের অবস্থানই আসল বিষয়। তার মতে, ইমরানকে নির্বাচনী মাঠে অবাধে ফিরতে দিলে তিনি আবারও ক্ষমতার বড় দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন।
সেই আশঙ্কা একেবারে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়াও কঠিন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে পিটিআইয়ের নির্বাচনী প্রতীক বাতিল থাকা এবং ইমরান কারাগারে থাকার পরও তার সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জাতীয় পরিষদে সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী হিসেবে উঠে এসেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত পিএমএল-এন ও পিপিপির জোট সরকার গঠন করে।
এ বার চিকিৎসা নিয়েও সংঘাত
ইমরানের বন্দিত্ব নিয়ে পুরনো বিতর্কের মধ্যেই এখন তার স্বাস্থ্য নতুন রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
পরিবার ও আইনজীবীদের অভিযোগ, কারাগারে তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্ট সরকারকে নির্দেশ দেয়, ৭৩ বছরের ইমরানকে আদিয়ালা কারাগার থেকে ইসলামাবাদের বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকসহ বিশেষজ্ঞ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষার নির্দেশও দেয় আদালত।
সরকার ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। তার পর আরও নাটকীয় ঘটনা ঘটে। ইমরানকে শিফায় নেওয়ার বদলে সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিমস) নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষার পর তাকে শারীরিক ভাবে স্থিতিশীল ঘোষণা করে আবার আদিয়ালা জেলে পাঠানো হয়। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসককেও সঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়নি বলে পিটিআই অভিযোগ করেছে। সরকার বলেছে, শিফার পথে পিটিআই সমর্থকদের জমায়েতের কারণে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় হাসপাতাল বদলানো হয়েছিল।
এ বার সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে পিটিআই। শনিবার সুপ্রিমকোর্টে আদালত অবমাননার আবেদন করেছে দলটি। প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পিটিআইয়ের বক্তব্য, দেশের সর্বোচ্চ আদালত যে হাসপাতালের নাম উল্লেখ করে নির্দেশ দিয়েছিল, সরকার তা ইচ্ছাকৃত ভাবে অমান্য করেছে।
চিকিৎসার সময় ইমরানের সঙ্গে দেখা করেন তার বোন উজমা খান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরান জানিয়েছেন, কারাগারে তার ওপর বারবার ‘নির্যাতন’ চালানো হচ্ছে। রয়টার্স এ অভিযোগ নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় এবং কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য চাইলেও তাৎক্ষণিক উত্তর পায়নি।
জেলে থেকেও রাজনীতির কেন্দ্রে
ইমরানকে ঘিরে আর একটি বৈপরীত্যও স্পষ্ট হচ্ছে। তিন বছরের বেশি সময় কারাগারে থেকেও তাকে পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে কার্যত সরানো যায়নি। তার দল এখনও বড় জনসমাবেশ করতে সক্ষম, সমর্থকদের বড় অংশ তাকেই দেশের পরবর্তী রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে দেখেন।
এমনকি সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কয়েক বছরের তীব্র সংঘাতের পর সম্প্রতি পিটিআইয়ের ভাষাতেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি বলেছেন, মুক্তি পেলে ইমরান সেনাবাহিনী বা মুনিরের সঙ্গে এমন সংঘাতে যাবেন না যা পাকিস্তানের ক্ষতি করে। তবে তিনি একই সঙ্গে জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে এখন কোনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না।
তাই হানানের নিবন্ধটি মূলত একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নের দিকে আঙুল তুলেছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে সেনাবাহিনীর প্রভাব নতুন নয়। দেশটির দীর্ঘ ইতিহাসের প্রায় অর্ধেক সময় সরাসরি সামরিক শাসন ছিল; বেসামরিক সরকারের সময়েও সেনাবাহিনীকে ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়েছে।
ইমরানও এই ব্যবস্থার বাইরে থেকে রাজনীতি শুরু করেননি। তার বিরোধীরা এখনও মনে করিয়ে দেন, ২০১৮ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার সময় তিনিও সামরিক প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পেয়েছিলেন। কিন্তু যে সম্পর্ক তাঁকে ক্ষমতায় ওঠার পথে সুবিধা দিয়েছিল বলে অভিযোগ, পরে সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সংঘাতে পরিণত হয়।
এ কারণেই বর্তমান বিতর্কটি শুধু ‘ইমরান নির্দোষ না দোষী’ এই প্রশ্নে আটকে নেই। প্রশ্ন আরও বড়: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যত জনপ্রিয়ই হোক, তার ভবিষ্যৎ ঠিক করবে আদালত ও ভোটার, না কি রাষ্ট্রের অন্য কোনও ক্ষমতাকেন্দ্র?
হানানের লেখার মূল সুর সেখানেই। ইমরানকে নিখুঁত গণতন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং তার রাজনৈতিক অধিকারও অন্য যে কোনও নেতার মতো একই আইনের আওতায় থাকা উচিত, এই যুক্তিই সামনে এনেছেন তিনি।
আর শনিবারের আদালত অবমাননার মামলা সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করল। তিন বছর ধরে জেলে থেকেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরানের ছায়া এতটুকু ছোট হয়নি। বরং এখন তার চিকিৎসার একটি হাসপাতালের নাম নিয়েও যে সরকার ও দেশের সর্বোচ্চ আদালত মুখোমুখি, তাতে পুরনো প্রশ্নটাই আরও জোরে ফিরে এসেছে, পাকিস্তানে শেষ কথা বলবে আইন ও ভোট, নাকি ক্ষমতার অদৃশ্য সমীকরণ?






