মুসলিমবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন ইমরান, বন্দি হতেই ‘ভুলে গেল’ বিশ্ব?

ছবি: রয়টার্স
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইসলামোফোবিয়াকে বিশ্বের সামনে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে তুলেছিলেন ইমরান খান। মুসলিমদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদকে এক করে দেখার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণার দাবিও তুলেছিলেন। কয়েক বছরের মধ্যেই জাতিসংঘ ১৫ মার্চকে ‘ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলার আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অথচ সেই ইমরান খান এখন তিন বছর ধরে কারাগারে। আর তার বন্দিত্ব নিয়ে যে মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও ইসলামোফোবিয়াবিরোধী মহলের বড় একটি অংশ নীরব, সেই নীরবতাকেই কাঠগড়ায় তুলেছে মিডল ইস্ট মনিটরের এক তীব্র মতামতধর্মী নিবন্ধ। লেখক জুনায়েদ এস আহমদের প্রশ্ন, ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই যদি সত্যিই নীতির প্রশ্ন হয়, তবে ইমরানের বেলায় সেই ভাষা এত দুর্বল কেন?
১০ জুন প্রকাশিত ‘ইমরান খান অ্যান্ড দ্য ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি দ্যাট বেরিড হিম’ শিরোনামের নিবন্ধে লেখকের মূল অভিযোগ, পশ্চিমা বিশ্বের মুসলিমবিদ্বেষ, ভারতে মুসলিমদের পরিস্থিতি কিংবা গাজা নিয়ে যারা নিয়মিত সরব, পাকিস্তানে ইমরান ও তার সমর্থকদের ওপর রাষ্ট্রীয় চাপের অভিযোগের ক্ষেত্রে তাদের অনেকের কণ্ঠ একই রকম জোরালো নয়। তার মতে, ইমরানকে সমর্থন করতেই হবে এমন নয়; তার রাজনীতি, সরকার কিংবা পিটিআইয়ের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনা যেন তার বন্দিত্ব ও সমর্থকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ নিয়ে নীরব থাকার অজুহাত না হয়।
এই যুক্তির পেছনে ইমরানের ইসলামোফোবিয়াবিরোধী ভূমিকার বাস্তব ইতিহাসও রয়েছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইসলামোফোবিয়াকে নিজের বক্তব্যের চারটি প্রধান বিষয়ের একটি করেন। ৯/১১-র পর সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ইসলামকে জুড়ে দেওয়ার প্রবণতাকে মুসলিমবিদ্বেষ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন। মুসলিম নারীর হিজাব থেকে শুরু করে পশ্চিমে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রান্তিকীকরণ, একাধিক বিষয় তুলে ধরেছিলেন তিনি।
পরের বছর জাতিসংঘেই আরও নির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন ইমরান। ২০২০ সালের সাধারণ পরিষদের ভাষণে তিনি ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণার আহ্বান জানান। সেই উদ্যোগ পরে পাকিস্তান ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) কূটনৈতিক প্রস্তাবে রূপ নেয়। ২০২২ সালের ১৫ মার্চ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মত ভাবে ১৫ মার্চকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে টু কমব্যাট ইসলামোফোবিয়া’ ঘোষণা করে। প্রস্তাবটি ওআইসির পক্ষে উত্থাপন করেছিল পাকিস্তান।
মিডল ইস্ট মনিটরের লেখকের বক্তব্য, এই কারণেই ইমরানের বর্তমান অবস্থানকে নিছক পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দলীয় রাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। তার দাবি, ইমরান মুসলিমদের শুধু বৈষম্যের ‘শিকার’ হিসেবে নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আত্মমর্যাদার অধিকারী জনগোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। আর এখন সেই নেতাই কারাবন্দি হওয়ার পর ইসলামোফোবিয়া নিয়ে কাজ করা একাংশের নীরবতা তাদের অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
লেখক আরও এক ধাপ এগিয়ে যুক্তি দিয়েছেন, ইসলামোফোবিয়া শুধু পশ্চিমা বা অমুসলিম রাষ্ট্রের হাতেই কার্যকর হয় এমন ধারণা অসম্পূর্ণ। তার মতে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের সরকারও ‘নিরাপত্তা’, ‘চরমপন্থা’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’-এর ভাষা ব্যবহার করে মুসলিম রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করতে পারে। সেই ব্যাখ্যায় পাকিস্তানে ইমরান ও পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাকে তিনি বৃহত্তর একটি কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখেছেন। এটি অবশ্য লেখকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ; পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী এমন ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
নিবন্ধে ব্রিটেনের ব্র্যাডফোর্ডের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর কথাও বিশেষ ভাবে এসেছে। অঞ্চলটিকে পাকিস্তানের বাইরে ইমরানের অন্যতম শক্তিশালী জনসমর্থনের কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে লেখকের প্রশ্ন, এত বড় প্রবাসী রাজনৈতিক আন্দোলন পাশেই থাকা সত্ত্বেও মুসলিম রাজনীতি ও উপনিবেশোত্তর চিন্তা নিয়ে কাজ করা কিছু প্রভাবশালী শিক্ষাবিদ তাঁদের সঙ্গে কতটা বাস্তবে যুক্ত হয়েছেন। তার অভিযোগ, শ্রমজীবী পাকিস্তানি মুসলিমদের রাজনৈতিক আবেগ তাত্ত্বিক আলোচনায় জায়গা পেলেও বাস্তব রাজনৈতিক সংহতির প্রশ্নে তাঁদের অনেক সময় উপেক্ষা করা হয়।
অবশ্য লেখক সবাইকে একই অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি। জেরেমি করবিন, তারিক আলি, নরম্যান ফিঙ্কেলস্টাইন, রজার ওয়াটার্স, ইয়ানিস ভারুফাকিস, জন এসপোসিটো-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ ও অধিকারকর্মীর নাম উল্লেখ করে বলেছেন, তারা ইমরান বা পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরব হয়েছেন। তার বক্তব্য, ইমরানের সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমর্থন না করেও তার নাগরিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলা সম্ভব।
লেখাটিতে ইমরানের পরিস্থিতির সঙ্গে মিসরের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির অবস্থার তুলনাও টানা হয়েছে। তবে এই তুলনা সম্পূর্ণ লেখকের রাজনৈতিক মূল্যায়ন। দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মামলা এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রেক্ষাপট এক নয়।
এখন কোথায় দাঁড়িয়ে ইমরান
বাস্তবে ইমরানের আইনি পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান তিনি। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দি। ক্ষমতা হারানোর পর তার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি প্রকাশ, সরকারি উপহার বিক্রি ও বিয়েসংক্রান্ত কয়েকটি মামলার সাজা পরে বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। কিন্তু আল-কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০২৫ সালে দেওয়া ১৪ বছরের সাজা এখন তার কারাবাসের প্রধান ভিত্তি। ইমরান সব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন; সরকার তা অস্বীকার করে।
পিটিআইয়ের অভিযোগ, ২০২২ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিত ভাবে ইমরানকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখছে। ইমরান নিজেও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরসহ সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ করেছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বরাবরই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা অবশ্য এখন বলছেন, তিনি মুক্তি পেলে সেনাপ্রধানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত না করে সমঝোতার পথ খুঁজতে পারেন৷ যদিও ইমরান নিজে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কিছু বলেননি।
এর মধ্যেই তার স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগের পর ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে হাসপাতালে নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দেয়। শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাকে ‘মেডিক্যালি ফিট’ ঘোষণার পর আবার রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে ফেরত পাঠান। তার পরিবার ও পিটিআই অভিযোগ করেছে, আদালতের নির্দেশ পুরোপুরি মানা হয়নি এবং দীর্ঘ বন্দিত্বে তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চলছে। পাকিস্তান সরকার শুক্রবারই সেই অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, ইমরান নিয়মিত চিকিৎসা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অন্যান্য সুবিধা পাচ্ছেন।
ফলে মিডল ইস্ট মনিটরের নিবন্ধটি কোনও নতুন মামলা বা সরকারি নথি প্রকাশ করছে না; বরং ইমরানের বন্দিত্বকে ঘিরে মুসলিম বুদ্ধিজীবী, ইসলামোফোবিয়াবিরোধী আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংহতির দ্বৈত মানদণ্ড আছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলছে। লেখকের বক্তব্য তর্কযোগ্য, এবং তার ব্যবহৃত ‘ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি’ শব্দবন্ধটিও ইচ্ছাকৃত ভাবে তীব্র ও ব্যঙ্গাত্মক।
তবে একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য অস্বীকার করা কঠিন। যে নেতা জাতিসংঘের মঞ্চে ইসলামোফোবিয়াকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে তুলেছিলেন এবং যে পাকিস্তানের উদ্যোগে ১৫ মার্চ এখন জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইসলামোফোবিয়াবিরোধী দিবস, সেই ইমরানই আজ কারাগারে নিজের চিকিৎসা ও রাজনৈতিক অধিকারের জন্য আইনি লড়াই করছেন। তাকে ঘিরে ‘নীরবতা’ সত্যিই দ্বিচারিতা, না কি পাকিস্তানের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল, বিতর্ক এখন সেই প্রশ্নেই।






