চিকিৎসার পর ফের কারাগারে, নতুন জল্পনা পাকিস্তানে
সমঝোতার গুঞ্জনে জল ঢাললেন ইমরান?

ছবি: রয়টার্স
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রায় তিন বছর পর জেলের বাইরে চিকিৎসার সুযোগ। চাইলে সেই হাসপাতালযাত্রাই কি হয়ে উঠতে পারত কারাবাস থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম দরজা? পাকিস্তানে যখন এমন জল্পনা তুঙ্গে, কয়েক ঘণ্টার স্বাস্থ্যপরীক্ষার পর আবার আদিয়ালা জেলেই ফিরলেন ইমরান খান। আর সেই ফিরে যাওয়াকেই তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী দেখছেন রাজনৈতিক চাল হিসেবে। তার দাবি, নওয়াজ শরিফের মতো চিকিৎসার পথ ধরে দেশ ছাড়ার সুযোগ খোঁজেননি ইমরান; বরং জেলে ফিরে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকেই রাজনৈতিক ভাবে ‘চেকমেট’ করেছেন।
ঘটনার শুরু ১৮ আগস্ট। পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, ৭৩ বছরের ইমরানকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে ইসলামাবাদের বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কয়েক দিন সেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ফয়সাল সুলতানসহ একটি বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল বোর্ড তাকে পরীক্ষা করবে, এমন নির্দেশও ছিল। পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ ও দুই ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলে আদালত।
কিন্তু বৃহস্পতিবার গভীর রাতের পর ঘটনাপ্রবাহ অন্য দিকে মোড় নেয়। শিফার বদলে ইমরানকে নিয়ে যাওয়া হয় সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিমস)। চোখ, হৃদ্যন্ত্র ও সাধারণ শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন বিশেষজ্ঞেরা। সরকারের দাবি, তাকে ‘মেডিক্যালি ফিট’ পাওয়া গেছে এবং ২১ আগস্ট ভোর পাঁচটার দিকে ফের আদিয়ালা কারাগারে পাঠানো হয়।
সরকার বলেছে, শিফা হাসপাতালের পথে ও হাসপাতালের বাইরে পিটিআই সমর্থকদের জমায়েতের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই কারণেই শেষ মুহূর্তে পিমসে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। সরকারের দাবি, এটি কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়।
কিন্তু ইমরানের দল সেই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। পিটিআইয়ের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল একেবারে স্পষ্ট–শিফা হাসপাতালে চিকিৎসা এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। অথচ তার চিকিৎসক ফয়সাল সুলতান শিফাতেই অপেক্ষা করে গিয়েছেন। দলটি ঘটনাকে আদালত অবমাননা বলে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই News18-এর প্রতিবেদনে সামনে এসেছে ইমরানের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিস্ফোরক ব্যাখ্যা। তার দাবি, ইমরান হাসপাতালে দীর্ঘ সময় থাকার আগ্রহ দেখাননি; প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষ হলে ফের কারাগারে ফিরে যাওয়ার অবস্থানেই ছিলেন। তার মতে, এর মধ্য দিয়ে ইমরান একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন—চিকিৎসার অজুহাতে কোনও ‘ডিল’ করে বেরিয়ে যাওয়ার পথে তিনি হাঁটছেন না।
এই জায়গাতেই এসেছে নওয়াজ শরিফের সঙ্গে তুলনা। ২০১৯ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাভোগের সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিন বারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। প্রথমে চিকিৎসার জন্য ছয় সপ্তাহের জামিন পান তিনি এবং সেই মেয়াদ শেষে আবার জেলেও ফিরে যান। পরে অক্টোবরে ফের চিকিৎসার ভিত্তিতে জামিন পাওয়ার পর ১৯ নভেম্বর ২০১৯ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে লন্ডনে যান চিকিৎসার জন্য। দীর্ঘ সময় পাকিস্তানের বাইরে থাকার পর ২০২৩ সালে দেশে ফেরেন তিনি।
তাই ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর ‘শরিফ নন’ মন্তব্যটি মূলত ওই পরবর্তী লন্ডনযাত্রার দিকেই ইঙ্গিত। তার বক্তব্যের সারকথা, ইমরান যদি হাসপাতালকে জেল থেকে বেরিয়ে আসার দীর্ঘমেয়াদি পথ হিসেবে ব্যবহার করতেন, তবে সেনা-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপন সমঝোতার গুঞ্জন আরও জোরালো হতো। বরং দ্রুত জেলে ফিরে তিনি সেই বয়ানটিই দুর্বল করেছেন।
তবে বিষয়টি এত সরলও নয়। গত কয়েক দিনেই ইমরান ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক-স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে অন্য ধরনের সংকেতও এসেছে। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি রয়টার্সকে বলেছেন, ইমরান মুক্তি পেলে সেনাবাহিনী বা আসিম মুনিরের সঙ্গে এমন কোনও সংঘাতে যাবেন না, যা দেশের ক্ষতি করে। তিনি মুনিরের পক্ষ থেকে একটি ‘সমঝোতার হাত’ বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, পিটিআই ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বর্তমানে কোনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না।
এই বক্তব্যের পরেই ইমরানকে হাসপাতালে পাঠানোর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আসে। ফলে ইসলামাবাদে গুঞ্জন ছড়ায়, তিন বছরের তীব্র বৈরিতার পর কি কোনও সমঝোতার পথ খুলছে?
ইমরানের চিকিৎসা নিয়ে সাম্প্রতিক ‘ছাড়’কে পাকিস্তানের বৃহত্তর ক্ষমতার খেলায় একটি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মুনির হয়তো পিএমএল-এন ও পিপিপির উপর চাপ ধরে রাখতে ইমরান ও পিটিআইকে আবার রাজনৈতিক ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ খোলা রাখছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা৷
ইমরানের হাসপাতালে যাওয়ার আগে তার সমর্থকদের মধ্যে আশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শিফার বদলে পিমস, ব্যক্তিগত চিকিৎসককে বাইরে রাখা এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জেলে ফেরত পাঠানোয় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বোন উজমা খান জানিয়েছেন, ভাইকে শারীরিক ভাবে মোটামুটি স্থিতিশীল দেখেছেন, তবে ইমরান তার কাছে দীর্ঘ বন্দিত্বে ‘চরম অন্যায় ও নির্যাতনের’ অভিযোগ করেছেন। সরকার সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, চিকিৎসা ও কারাগারের নথিতে নির্যাতন বা চিকিৎসা-বঞ্চনার প্রমাণ নেই।
ইমরান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দি। তার বিরুদ্ধে বহু মামলা হয়েছে। তিনি সবগুলোকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন; পাকিস্তান সরকার সেই অভিযোগ অস্বীকার করে। বর্তমানে তার কারাবাসের অন্যতম প্রধান ভিত্তি দুর্নীতির মামলার সাজা।
আর তার সঙ্গে আসিম মুনিরের সংঘাত পাকিস্তানের গত কয়েক বছরের রাজনীতির কেন্দ্রেই রয়েছে। ২০২২ সালে ক্ষমতা হারানোর পর ইমরান ক্রমশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরব হন। মুনিরকে ব্যক্তিগত ভাবেও কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন তিনি। সেনাবাহিনী বরাবর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ফলে শুক্রবার ভোরে আদিয়ালা জেলে ফিরে যাওয়া শুধুই একজন বন্দির হাসপাতাল থেকে কারাগারে প্রত্যাবর্তন নয়, পিটিআই এখন সেটিকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরতে চাইছে।
তবে ‘মুনিরকে চেকমেট’ করা হয়েছে কি না, তার উত্তর এখনই দেওয়া কঠিন। কারণ ইমরান এখনও জেলেই, তার মুক্তির কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত হয়নি এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোনও নিশ্চিত সমঝোতার প্রমাণও সামনে আসেনি।
কিন্তু একটি জায়গায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বক্তব্য রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, ইমরান যেন দেখাতে চাইছেন, মুক্তি যদি আসে, তা ‘চিকিৎসার দরজা দিয়ে কোনও গোপন সমঝোতায়’ নয়; রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই আসুক। পাকিস্তানের ক্ষমতার দাবায় সেটি সত্যিই ‘চেকমেট’, নাকি আরও দীর্ঘ খেলার মাত্র একটি চাল, এখন নজর সেদিকেই।






