ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ
নিজের অস্ত্রে নিজেই ঘায়েল যুক্তরাষ্ট্র
- প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক যুদ্ধ গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওয়াশিংটনের

প্রতীকী ছবি
চীন বিরল মাটির খনিজের ওপর তার আধিপত্য ব্যবহার করে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধে একটি যুদ্ধবিরতি।
এরপর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলাকে কেন্দ্র করে তেহরান কার্যত বন্ধ করে দেয় হরমুজ প্রণালি, জিম্মি করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তার ছয় সপ্তাহের যুদ্ধকে নিয়ে যায় একটি যুদ্ধবিরতির দিকে।
ওয়াশিংটন একসময় ভোগ করত এই ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধের প্রায় একচেটিয়া সুবিধা। অবাধ্য দেশগুলোকে শাস্তি দিত ডলার ব্যবহারে বা সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
কিন্তু কভিড মহামারী, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের অবনতির মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংহতির প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে দেখতে শুরু করে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সম্ভাব্য চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে।
এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপ-সবাই গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দেশীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ করে এগোচ্ছে তাদের অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা জোরদার করার দিকে।
চেকপয়েন্টস বইয়ের লেখক এডওয়ার্ড ফিশম্যানের ভাষ্য, বৈশ্বিক অর্থনীতি ১৯৯০-এর দশকের সেই সহনশীল পরিবেশের জন্য তৈরি হয়েছিল, যখন আমরা ধরে নিয়েছিলাম আমাদের বন্ধু হয়ে উঠবে চীন ও রাশিয়া। কিন্তু আমরা এখন বাস করছি তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে লেখা এই লেখক মনে করেন, এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে, যতক্ষণ না গড়ে ওঠে একটি নতুন বৈশ্বিক অর্থনীতি।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাসী ট্রাম্প প্রায়ই এমনভাবে কথা বলেন যেন তার দেশ অবস্থান করছে অন্যদের থেকে আলাদা এক স্তরে। তিনি বিশ্বায়নের সমালোচনা করেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে চাকরি ও সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার জন্য।
এই বছরের শুরুতে তিনি বক্তব্যে তুলে ধরেন, মার্কিনিদের ‘কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই কানাডা (যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানি উৎস) থেকে।’
যুক্তরাষ্ট্র ‘জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ’ বলেও গর্ব করেন ট্রাম্প। যদিও দেশটি কিছু পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানির ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া অল্প পরিমাণও অন্তর্ভুক্ত।
স্নায়ু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যে বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলো গড়ে উঠেছিল, সেগুলোতে বিপদ দেখছেন ট্রাম্পের কিছু শীর্ষ উপদেষ্টা। বিশেষ করে যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ভরশীল করে তুলেছে তার প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের ওপর।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন, অন্য দেশের অর্থনৈতিক প্রভাব আমাদের বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের সক্ষমতাকে করবে সীমিত, যদি না যুক্তরাষ্ট্র বৈচিত্র্যময় করে তার সরবরাহ চেইন।
গত বছর এক ভাষণে রুবিও মন্তব্য করেন, একবিংশ শতাব্দীর শীর্ষস্থানীয় শিল্পগুলোর মধ্যে প্রায় কোনো ক্ষেত্রই নেই- যেখানে আমাদের নেই কোনো না কোনো ধরনের দুর্বলতা। এটি এখন হয়ে উঠেছে আমাদের সামনে থাকা সর্বোচ্চ ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি।
যুক্তরাষ্ট্র হিমশিম খাচ্ছে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে। ট্রাম্প নিজের উভয় মেয়াদেই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ব্যাপক ব্যবহার করেছেন দেশ, ব্যক্তি এবং কোম্পানিকে লক্ষ্য করে। তিনি ২০১৮ সালে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন ইরানের ওপর, পরের বছর ভেনেজুয়েলার ওপর প্রয়োগ করেন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ এবং নেন একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
ট্রাম্প চলতি মেয়াদে ইরানের ওপর আরোপ করেছেন আরও নিষেধাজ্ঞা। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ করে প্রায় ২০ হাজার চীনা কোম্পানিকে এনেছেন এর আওতায় এবং উন্নত চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি ও জেট ইঞ্জিনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেছেন চীনের জন্য।
তবে অন্য দেশগুলো যখন তাদের অর্থনৈতিক সুবিধাকে ব্যবহার করেছে অস্ত্র হিসেবে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন অনেকটাই হয়ে পড়েছে অপ্রস্তুত।
গত এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের শুল্কের জবাবে চীন যখন বিরল খনিজ পদার্থের রপ্তানি নিষিদ্ধ করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সামাজিক মাধ্যমে এটিকে অভিহিত করেন ‘একটি সত্যিকারের বিস্ময়’ বলে। এই খনিজ পদার্থ বেসামরিক ও সামরিক পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
একইভাবে, ইরান যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তখনো যুক্তরাষ্ট্রের কার্যত ছিল না কোনো কার্যকর জবাব। শিপিং কোম্পানিগুলো ইরানের হুমকির মুখে ঝুঁকি নিতে রাজি না হওয়ায় তেলের বাজার হয়ে ওঠে অস্থির।
যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের ওপরে চলে যায় এবং এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো হয় ক্ষতিগ্রস্ত।
‘আন্ডারগ্রাউন্ড এম্পায়ার’ নামের অর্থনৈতিক যুদ্ধবিষয়ক বইয়ের সহ-লেখক হেনরি ফারেলের ভাষ্য, মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নেই সব কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বিন্দু। আমরা এমন এক পৃথিবীতে আছি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর সহজে করতে পারে না সেই সব কাজ, যেগুলো তারা আগে ভাবত করতে পারবে সহজেই।
ইরানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও প্রায় ৩ হাজার ২০০টি জাহাজ পারস্য উপসাগরে প্রণালির পশ্চিম দিকে আটকে আছে বলে জানিয়েছে লন্ডনের সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড, যার মধ্যে রয়েছে ৮০০টি ট্যাংকার ও পণ্যবাহী জাহাজ।
ইরান কিছু জাহাজকে সীমিতভাবে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, তবে শর্ত হলো তাদের দিতে হবে টোল এবং হতে হবে অশত্রু দেশের।
ইরানি কর্তৃপক্ষ কার্যত একটি জনপ্রিয় নাইটক্লাবের বাউন্সারের মতো আচরণ করছে- কিছু সৌভাগ্যবান গ্রাহককে প্রণালিতে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে, আর অন্যদের জন্য হতাশার অপেক্ষা।
ইরানের হরমুজ প্রণালির ওপর চলমান নিয়ন্ত্রণ শুধু মার্কিনিদের গ্যাসোলিন ও ডিজেলের দামই বাড়ায়নি, বরং এটি বাড়াতে শুরু করেছে ম্যাট্রেস, সার, অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক এবং ফল ও সবজির দামও।
ফ্লোরিডার একটি ফল ও সবজি উৎপাদক কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্বাস জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেলের দামে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি প্রায় সব খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে তাদের কার্যক্রমের।
তার মতে, গত ছয়-সাত সপ্তাহে জ্বালানির খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে, একপর্যায়ে ৩০ শতাংশেরও বেশি, আর সেই ৩০ শতাংশ সরাসরি প্রতিটি জিনিসের খরচ বৃদ্ধিতে পরিণত হয়, যা এর সঙ্গে সম্পর্কিত। আমার মনে হয় না, এখনো এই যুদ্ধের প্রভাব পুরোপুরি বুঝতে পেরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা।
আব্বাস যখন ভবিষ্যতের দিকে তাকান, তিনি ক্রমেই একটি অন্ধকারময় দৃশ্য দেখতে পান- আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি, ধীরগতির অর্থনীতি, উন্নয়নশীল বিশ্বে খাদ্যসংকট এবং অর্থনৈতিক সমস্যা, যা বন্দুকের শব্দ থেমে যাওয়ার অনেক পরেও রয়ে যাবে।



