১৫ কোটি বছর আগের ডাইনোসর কীভাবে মিলল থাইল্যান্ডে?

সংগৃহীত ছবি
ডাইনোসর। নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল আকৃতির এক প্রাণী। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী শাসন করত তারা। কিন্তু প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় এই প্রাণীগুলো। তারপরও তাদের গল্প শেষ হয়নি। কারণ, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা জীবাশ্ম এখনো নতুন নতুন ইতিহাসের সন্ধান দিচ্ছে।
এবার তেমনই এক চমক দেখাল থাইল্যান্ড। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কালাসিন প্রদেশে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন নতুন একটি ডাইনোসর প্রজাতির জীবাশ্ম। গবেষকদের ধারণা, এই ডাইনোসরটি প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করত। অর্থাৎ, এটি ছিল জুরাসিক যুগের বাসিন্দা।
নতুন প্রজাতিটির নাম রাখা হয়েছে উরাগাসরাস কালাসিনেনসিস। এটি ছিল তৃণভোজী ডাইনোসর। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অস্বাভাবিক লম্বা গলা। পুরো দেহের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২০ মিটার বা ৬৬ ফুট। যা প্রায় একটি ক্রিকেট পিচের সমান।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, লম্বা গলার কারণে এটি সহজেই উঁচু গাছের পাতা খেতে পারত। অন্য প্রাণীরা যেখানে পৌঁছাতে পারত না, সেখানে অনায়াসেই মুখ বাড়াতে পারত এই ডাইনোসর।
এই আবিষ্কারের গল্পটিও বেশ মজার। ২০০৮ সালে থাইল্যান্ডের ফু নই এলাকায় এক স্থানীয় ব্যক্তি কিছু অদ্ভুত পাথরের টুকরো খুঁজে পান। দেখতে অনেকটা সাপের আঁশের মতো ছিল সেগুলো। বিষয়টি জানার পর সেখানে যান গবেষকেরা।
শুরু হয় খননকাজ। একটির পর একটি জীবাশ্ম বেরিয়ে আসতে থাকে। পাওয়া যায় ডাইনোসরের দাঁত। মেলে বিভিন্ন হাড়ের অংশও। পরে একটি পিঠের কশেরুকা বা মেরুদণ্ডের হাড় গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই একটি হাড়ই খুলে দেয় নতুন রহস্যের দুয়ার।
জীবাশ্মটি সিটি স্ক্যান করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, এটি ‘ম্যামেনচিসোরিডি’ পরিবারের একটি ডাইনোসর। এই পরিবারের সদস্যরা তাদের অত্যন্ত লম্বা গলার জন্য পরিচিত।
এ ধরনের ডাইনোসরের অধিকাংশ জীবাশ্ম এতদিন চীনেই পাওয়া গেছে। তবে এই পরিবারের ডাইনোসরের জীবাশ্ম থাইল্যান্ডে এবারই প্রথম মিলল।
গবেষকেরা আরও জানান, ডাইনোসরটির হাড়ে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যা বিশ্বের অন্য কোনো পরিচিত ডাইনোসরের সঙ্গে মেলে না। বিশেষ করে হাড়ের ভেতরের বায়ুকুঠুরির গঠন এবং ‘ওয়াই’ আকৃতির অস্থি বিন্যাস একেবারেই আলাদা। এই বৈশিষ্ট্যই এটিকে নতুন প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সাহায্য করেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক থাইল্যান্ডের মহাসারাখাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. আপিরুত নিলপানাপান জানালেন, নতুন প্রজাতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিলেন যে ভুল করে নিজের কম্পিউটার ভেঙে ফেলেন। পরে অবশ্য তিনি স্বস্তিও অনুভব করেন। কারণ, বহু বছরের গবেষণার ফল অবশেষে মিলেছে।
গবেষণাটি সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
ডাইনোসরদের ইতিহাসও কম বিস্ময়কর নয়। প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে ট্রায়াসিক যুগে পৃথিবীতে প্রথম ডাইনোসরের আবির্ভাব ঘটে। এরপর জুরাসিক ও ক্রিটেশিয়াস যুগজুড়ে প্রায় ১৬ কোটি বছর পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করে তারা। বিশাল আকৃতির তৃণভোজী থেকে শুরু করে ভয়ংকর মাংসাশী—বিভিন্ন ধরনের ডাইনোসর সে সময় পৃথিবীতে বিচরণ করত।
তবে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপ এলাকায় একটি বিশাল গ্রহাণু আঘাত হানে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। এর ফলে ভয়াবহ জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে। সূর্যের আলো দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হয়। খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রাণীর সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে যায় অধিকাংশ ডাইনোসরও।
তবু তাদের গল্প থেমে নেই। প্রতিটি নতুন জীবাশ্ম যেন কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর একটি নতুন অধ্যায় খুলে দেয়। থাইল্যান্ডে আবিষ্কৃত নতুন এই ডাইনোসরও সেই ইতিহাসে যোগ করল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের মে মাসেও থাইল্যান্ডে ‘নাগাটাইটান’ নামে আরেকটি দীর্ঘ গলার তৃণভোজী ডাইনোসরের সন্ধান পেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ‘২৭ মিটার’ লম্বা এবং ‘২৭ টন’ ওজনের ওই ডাইনোসরটি এখন পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় ডাইনোসর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




