আবার অন্ধকারে কিউবা, ভেঙে পড়ল বিদ্যুৎ গ্রিড
- জ্বালানি সংকটে দ্বীপজুড়ে হাহাকার
- আমেরিকার নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করল হাভানা

আলো নিভে গেলে শুধু ঘর অন্ধকার হয় না, থমকে যায় একটি দেশের স্পন্দন। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ফের সেই অন্ধকার নেমে এল ক্যারিবীয় দ্বীপ কিউবায়। এক মুহূর্তে থেমে গেল বিদ্যুতের প্রবাহ, স্তব্ধ হয়ে গেল শহরের গতি, আর কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন আটকে গেল অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে। কয়েক মাসের জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যে ফের ভেঙে পড়ল কিউবার জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে রাজনৈতিক ও মানবিক উদ্বেগ।
কিউবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড শুক্রবার সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উচ্চ ভোল্টেজের ট্রান্সমিশন লাইনে ত্রুটির কারণে এই বিপর্যয় ঘটে। পরে পুরো জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিউবার জ্বালানি মন্ত্রক জানায়, তারা দ্রুত বিদ্যুৎ পরিষেবা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ শুরু করেছে।
রাজধানী হাভানা-সহ গোটা দ্বীপে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। সন্ধ্যার দিকে হাসপাতাল ও জরুরি পরিষেবা কেন্দ্রগুলির আশপাশে সীমিত বিদ্যুৎ ফিরলেও শহরের বড় অংশ তখনও অন্ধকারে ডুবে ছিল। বিদ্যুৎ ফেরানোর কাজ ধাপে ধাপে চালানোর কথা জানিয়েছে কিউবার জাতীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ‘ইউনিয়ন ইলেকট্রিকা’ (ইউএনই)।
এই ঘটনা কিউবার জন্য নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারির পর থেকে এটি একাধিকবারের মধ্যে আরেকটি বড় জাতীয় বিদ্যুৎ বিপর্যয়। দীর্ঘদিন ধরে জীর্ণ বিদ্যুৎ পরিকাঠামো, পুরনো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং তীব্র জ্বালানি ঘাটতির কারণে দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চাপে রয়েছে।
কিউবার সরকার এই সংকটের জন্য মার্কিন জ্বালানি নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছে। হাভানার অভিযোগ, আমেরিকার আরোপিত তেল সরবরাহ সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অতীতে বলা হয়েছে, কিউবার অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য দেশটির নিজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যাও দায়ী।
হাভানার বাসিন্দা ৬০ বছরের কর্মী মার্সিডিস রদ্রিগেজ সংবাদ সংস্থা এপিকে বলেছেন, “এই লাগাতার বিদ্যুৎ বিভ্রাট আর সহ্য করা যাচ্ছে না। খাবার নেই, জল নেই, বিদ্যুৎ নেই৷ আমরা যে পরিস্থিতির মধ্যে আছি, তা বোঝানো কঠিন।” তাঁর কথায় উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের হতাশা ও ক্লান্তি।
আর এক বাসিন্দা ফ্র্যাঙ্ক লরেঞ্জো বলেছেন, এর আগেও তিনি ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছাড়া ছিলেন। অল্প সময়ের জন্য আলো ফিরলেও আবার পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই সংকট এখন বহু কিউবান পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউবার বিদ্যুৎ সঙ্কট শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জ্বালানি আমদানির সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হাসপাতাল, জল সরবরাহ ব্যবস্থা, যোগাযোগ পরিষেবা এবং সাধারণ মানুষের কর্মজীবন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও কিউবার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং জ্বালানি সরবরাহে বাধার মানবিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিউবার দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধ এই বিদ্যুৎ সঙ্কটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আপাতত কিউবার মানুষ অপেক্ষা করছেন আলো ফেরার জন্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, একটি দ্বীপ রাষ্ট্র কত দিন এমন অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে? বিদ্যুতের এই বারবার পতন এখন শুধু প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়, কিউবার গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।



