ইসরায়েলে ভোট শুরু, যেভাবে নির্বাচিত হবে নতুন সরকার

তেল আবিবের একটি কেন্দ্রে ব্যালট পেপার বক্সে ফেলছেন একজন ইসরায়েলি ভোটার। ছবি: রয়টার্স
গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ এবং লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন ইসরায়েলিরা। আজ মঙ্গলবারের এ নির্বাচনে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০ আসনের সদস্য নির্বাচিত হবেন। একই সঙ্গে নির্ধারিত হবে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। দেশটির সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটির (সিইসি) তথ্যানুযায়ী, বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রে এ সময়সূচি অনুযায়ী একটানা ভোটগ্রহণ চলবে এবং নির্ধারিত সময়ের পর লাইনে থাকা ভোটাররাও ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য প্রায় ৭৩ লাখ মানুষ। নির্বাচনের দিন ইসরায়েলে সরকারি ছুটি।
১৯ বছর ধরে বিভিন্ন মেয়াদে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন নেতানিয়াহু। দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চলার মধ্যেই এবারও ক্ষমতায় থাকতে লড়ছেন তিনি। তার লিকুদ পার্টি ও অতি-ডানপন্থী মিত্রদের সঙ্গে বিরোধী জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তবে কোনো পক্ষই সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে ভোটের পর সরকার গঠনে শুরু হতে পারে জটিল জোটের হিসাব।
যেভাবে ভোট হয়
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বা কোনো প্রার্থীকে ভোট দেন না। তারা ভোট দেন রাজনৈতিক দলকে।
নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ আসনের সমর্থন। ইসরায়েলের ইতিহাসে কোনো দলই এককভাবে এত আসন পায়নি। ফলে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই কোনো দলের ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত হয় না।
জাতীয় নির্বাচনে একটি দল যত শতাংশ ভোট পায়, মোটামুটি সেই অনুপাতে নেসেটে আসন পায়। তবে পার্লামেন্টে ঢুকতে হলে একটি দলকে মোট ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হবে।
এর কম ভোট পাওয়া দলের ভোট আসন বণ্টনের হিসাবে থাকে না। এ কারণেই নির্বাচনের আগে ছোট দলগুলোর মধ্যে জোট বা একীভূত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
নির্বাচনের পর ৬১ আসনের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা শুরু হয়। এজন্য প্রথমে ২৮ দিন সময় দেওয়া হয়। প্রয়োজনে আরও সর্বোচ্চ ১৪ দিন বাড়ানো যায়। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষ সরকার গঠন করতে না পারলে আবার নির্বাচন হতে পারে।
কারা ভোট দিতে পারেন, কারা পারেন না
ইসরায়েলের প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিক এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য। তাদের মধ্যে ইহুদি ইসরায়েলিদের পাশাপাশি প্রায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকও রয়েছেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরাও ভোট দিতে পারেন।
তবে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী প্রায় ৩০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না।
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের অধিকাংশ ফিলিস্তিনির ইসরায়েলি নাগরিকত্ব নেই। তারা স্থায়ী বাসিন্দা। ফলে জেরুজালেমের স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও নেসেট নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না।
ইসরায়েলের বাইরে বসবাসকারী অধিকাংশ নাগরিকও বিদেশ থেকে ভোট দিতে পারেন না। সাধারণ ভোটারদের নির্বাচনের দিন দেশে উপস্থিত থাকতে হয়। তবে কূটনীতিক ও সরকারি প্রতিনিধিরা বিদেশে ইসরায়েলি মিশনে আগাম ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।
মূল লড়াই নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের
নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত মুখ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গত ৩০ বছরের মধ্যে ১৯ বছরই ইসরায়েলের সরকারপ্রধান ছিলেন তিনি। এবারও তার লিকুদ পার্টি ও অতি-ডানপন্থী মিত্রদের নিয়ে ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছেন।
নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চলায় এবারের নির্বাচন নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ।
তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। তুলনামূলকভাবে নতুন এই রাজনীতিকের নেতৃত্বাধীন দলের নাম ‘ইয়াশার’, যার অর্থ ‘সততা’।
মরক্কো থেকে ইসরায়েলে যাওয়া অভিবাসী পরিবারের সন্তান আইজেনকোট সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ পর্যন্ত উঠেছিলেন। গাজা যুদ্ধে তার ছেলে ও দুই ভাতিজা নিহত হয়েছেন।
ভোটারদের সামনে যেসব ইস্যু
এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা বড় বিষয়। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং এরপর গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে সংঘাত ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
সরকারবিরোধীরা ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুর সরকারকে দায়ী করছে। তারা ওই ঘটনা তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়া, ধর্মীয় কট্টরপন্থার উত্থান, দীর্ঘ যুদ্ধের ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাও বিরোধীদের প্রচারণায় রয়েছে।
আরেকটি বড় বিষয় অতি-রক্ষণশীল ইহুদি বা হারেদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি। বিরোধী শিবিরের অধিকাংশ দল এ অব্যাহতি তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর অতি-রক্ষণশীল মিত্ররা পুরনো অব্যাহতি এবং ধর্মীয় শিক্ষায় সরকারি ভর্তুকি বহাল রাখতে চায়।
নেতানিয়াহু ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার দায় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়েছেন। তার দাবি, ইসরায়েলকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ শুধু তারই রয়েছে।
তার অতি-ডানপন্থী মিত্রদের কয়েকজন গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া এবং ইসরায়েলি বসতি আরও সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিও ভোটারদের বড় উদ্বেগের বিষয়।
কী বলছে জরিপ
অধিকাংশ জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ ও বর্তমান জোটকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে দেখা গেছে। গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে তাদের সমর্থন কমার এ প্রবণতা মোটামুটি স্থির রয়েছে।
জরিপে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত সমর্থন বেশি দেখা গেলেও তাদের মধ্যে বড় বিভাজন রয়েছে।
একদিকে আইজেনকোটের ইয়াশারের নেতৃত্বে ইহুদি ইসরায়েলিবিরোধী দলগুলো। অন্যদিকে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো।
ইহুদিবিরোধী দলগুলো এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে মনে হচ্ছে না। আবার তাদের বেশির ভাগই ফিলিস্তিনি দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে।
তবে নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী জোটকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ইহুদি দলগুলোর সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ফিলিস্তিনি রাজনীতিকরা।
কখন জানা যাবে ফল
ইসরায়েলি সময় রাত ১০টায় ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুথফেরত জরিপ প্রকাশের কথা রয়েছে। প্রকৃত ভোট গণনার প্রথম চিত্র পাওয়া যেতে পারে রাতের শেষ ভাগে।
তবে চূড়ান্ত ফল জানতে বেশি সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে দুটি ছোট দলের ফল সরকার গঠনের হিসাব বদলে দিতে পারে।
সাবেক জেনারেল ওফের উইন্টারের নেতৃত্বাধীন অতি-ডানপন্থী আমখা ইসরায়েল পার্লামেন্টে ঢুকতে পারলে নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রী করতে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যদিকে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার পক্ষে থাকা ডানপন্থী জায়নবাদী দল দ্য রিজার্ভিস্টস দুই প্রধান শিবিরের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। দলটি অতি-রক্ষণশীল অথবা ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থননির্ভর কোনো সরকারে যোগ দেবে না বলে জানিয়েছে।
দুটি দলই ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের সীমার কাছাকাছি রয়েছে। সীমা পার হলে প্রত্যেকটি প্রায় চারটি করে আসন পেতে পারে। ফলে হাড্ডাহাড্ডি ফল হলে পূর্ণ চিত্র পরিষ্কার হতে এক দিনেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
ফল প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট সরকার গঠনের সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে এমন নেতাকে জোট গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন।
ভোটাধিকার নিয়েও প্রশ্ন
নির্বাচনের পাশাপাশি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডে কারা ভোট দিতে পারেন, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ভোট দিতে পারেন। একই এলাকায় সামরিক শাসনের অধীনে থাকা প্রায় ৩১ লাখ ফিলিস্তিনির সেই অধিকার নেই।
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ভোটাধিকার থাকা দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি ইসরায়েলির পাশাপাশি প্রায় সাড়ে তিন লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন, যাদের অধিকাংশ নেসেট নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না।
গাজার প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিরও ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার নেই।
ফলে মঙ্গলবার ইসরায়েলিরা শুধু নতুন নেসেট নির্বাচন করছেন না। এই ভোটের ফল নির্ধারণ করবে নেতানিয়াহু আরও এক মেয়াদ ক্ষমতায় থাকবেন কি না এবং দেশটির পরবর্তী সরকার কোন জোটের হাতে যাবে।
সূত্র : আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান










