ডার্ক ট্রানজিট
হরমুজে ইরানকে ফাঁকি দিয়ে যেভাবে তেল সরাচ্ছে মার্কিন মিত্ররা

ওমান উপসাগ থেকে হরমুজ প্রণালির দৃশ্য। ফাইল ছবি: রয়টার্স
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে নতুন কৌশল নিয়েছে ওয়াশিংটন ও তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সহায়তায় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানিগুলো তেলবাহী ট্যাংকারের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে রাতে প্রণালিটি পার হচ্ছে। ইরানের সম্ভাব্য ড্রোন হামলা এড়িয়ে পারস্য উপসাগর থেকে তেল সরিয়ে নেওয়াই এর লক্ষ্য।
এআইএস ট্রান্সপন্ডার এমন এক বেতার যন্ত্র, যা জাহাজের পরিচয়, গতি, গতিপথ ও অবস্থান জানায়। বিশ্ব জুড়ে সমুদ্রপথে চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এর মাধ্যমে জাহাজের খবর রাখে। এটি বন্ধ করলে মনে হবে যেন হঠাৎ করেই জাহাজটি অদৃশ্য হয়ে গেছে।
নতুন এই কৌশলে তেল পরিবহনের ঝুঁকি বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনাকারীদের কাছ থেকে অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও তেল উৎপাদক দেশগুলোর ওপর চলে গেছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে।
ট্রান্সপন্ডারভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলার ও ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের হিসাবের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
জুলাইয়ের শেষদিকে গ্রিক মালিকানাধীন সুপারট্যাংকার কিকু কাতারের মেসাইয়েদ তেল রপ্তানি টার্মিনালে ভিড়ে। চার দিন পর অপরিশোধিত তেল নিয়ে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। ৩১ জুলাই দুবাইয়ের উপকূলের কাছে কিকুর এআইএস ট্রান্সপন্ডার বন্ধ হয়ে যায়।
১ আগস্ট কিকুর সংকেত আবার হরমুজ প্রণালির অন্য পাশে দেখা যায়। পরে জানা যায়, ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাহারায় রাতে প্রণালিটি পার হওয়ার নতুন কৌশলের অংশ ছিল কিকুর এই যাত্রা।
কিকুর মতো আরও অনেক জাহাজ এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তেলবাহী জাহাজগুলো পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগরে যাচ্ছে। সেখানে অপেক্ষমাণ ক্রেতাদের ট্যাংকারে অপরিশোধিত তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। এরপর জাহাজগুলো আবার প্রণালি পেরিয়ে ফিরে যাচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন গত দুই দিনে ওমান উপসাগরে এমন একডজনের বেশি জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর সরেজমিনে দেখেছে। এসব তেলবাহী জাহাজ চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো গন্তব্যে যাচ্ছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির প্রায় ৮০ শতাংশ জাহাজ চলাচল ছিল ‘ডার্ক’ বা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা অবস্থায়। জাহাজগুলো ইরান থেকে যতটা সম্ভব দূরে ওমানের উপকূল ঘেঁষে চলাচল করছে।
তবে মাত্র ২৩ মাইল প্রশস্ত প্রণালিটিতে জাহাজ লুকিয়ে চলাচল করা কঠিন। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকলেও রাডারের মাধ্যমে জাহাজ শনাক্ত করা সম্ভব। চলতি সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি জাহাজও হামলার শিকার হয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকরা শুধু এই কৌশলের ওপর নির্ভর করছে না। সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পারস্য উপসাগরের অপেক্ষমাণ ট্যাংকারের পরিবর্তে ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছে।
অন্য মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকরা প্রতিদিন আরও প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে রপ্তানি করছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশও তেল উৎপাদন বাড়িয়েছে। ব্রাজিল, গায়ানা ও ভেনেজুয়েলা মিলিয়ে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি অতিরিক্ত তেল উৎপাদন করছে। যুক্তরাষ্ট্রও প্রতিদিন কয়েক লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল বাজারে যোগ করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জরুরি মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে। এতে দেশটির স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের মজুদ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। চীনও নিজেদের বিশাল তেল মজুদের ওপর নির্ভর করছে এবং একই সময়ে অপরিশোধিত তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক চাহিদাও কমেছে। ফলে তেল বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য কিছুটা বজায় রয়েছে।
তবে এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। যুদ্ধ চলাকালে বিশ্ব জুড়ে তেলের মজুদ ১৯০ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত কমে গেছে। বাজারে ভারসাম্য ফিরলে এসব মজুদ আবার পূরণ করতে হবে। তা না হলে মজুদ এতটাই কমে যেতে পারে যে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা মেটাতে সেগুলোর ওপর আর নির্ভর করা সম্ভব হবে না। তখন চাহিদা কমাতে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
জ্বালানি বাজারেও সংকট আরও গভীর হয়েছে। বিশ্বের চারটি প্রধান পরিশোধনকেন্দ্রের মধ্যে তিনটি তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং ওই অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি কমেছে।
রাশিয়াও ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে। দেশটির শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মস্কোও রপ্তানি কমিয়েছে।
চীন নিজেদের জ্বালানি সংকট এড়াতে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করছে। ফলে বৈশ্বিক চাহিদার বড় অংশের চাপ পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলোর ওপর। তবে এসব শোধনাগারও অনির্দিষ্টকাল পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না।
বিশেষ করে গ্যাস, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দামের তুলনায় এসব জ্বালানির দাম অনেক বেশি হারে বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনার কথা বলে তেলের দাম কম রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বদলেছে। ইরানের বন্দরগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী নৌ-অবরোধের মাধ্যমে দেশটির ওপর ‘অর্থনৈতিক চাপ’ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এতে কয়েক সপ্তাহ ধরে তেলের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে।
দুই দেশ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জটিলতায় আটকে থাকায় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত চলমান আছে। এর প্রভাব, বিশেষ করে গ্যাস, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দামে পড়ছে। এতে ভোক্তাদের খরচ ও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকদের নতুন কৌশল এবং বিশ্ববাজারের বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত সংকটকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিতে দেয়নি, যা বিশ্বের অন্যতম বড় তেল সরবরাহ সংকটের মধ্যেও তেলের দাম অনেক বেশি বেড়ে যাওয়া থেকে কিছুটা ঠেকিয়ে রেখেছে।
সূত্র : সিএনএন







