বারবার হামলায় বিপর্যস্ত ইরানের বন্দরনগর
যুদ্ধবিরতি কাগজে, বন্দর আব্বাসে রাত জাগে বিস্ফোরণের ভয়

ছবি: রয়টার্স
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা। কূটনৈতিক আলোচনায় শান্তির আশ্বাস। অথচ ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর আব্বাসে সামান্য শব্দেও বিস্ফোরণের আতঙ্ক, রাতভর কান পেতে থাকা এবং প্রিয়জনকে হারানোর ভয়।
এই শহরের ৪৪ বছর বয়সী এক মা পারিসার অভিজ্ঞতায় যুদ্ধবিরতি কখনও আসেনি। নিরাপত্তার কারণে তাঁর পুরো পরিচয় প্রকাশ করেনি আলজাজিরা। বুধবার (৫ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতামূলক প্রতিবেদনে বারবার হামলার মধ্যে নিজের জীবন, পরিবার ও শহরের মানুষের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে বন্দর ও বিমানবন্দরে হামলা
১১ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠে শহরের দুই প্রান্তে ধোঁয়ার দুটি স্তম্ভ দেখেছিলেন পারিসা। এক দিকে ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক বন্দর শহীদ রাজাই, অন্য দিকে বন্দর আব্বাস বিমানবন্দর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একই সময়ে হামলা হয়েছিল দুই জায়গায়।
পারিসার কাছে এটি জীবনের তৃতীয় যুদ্ধ। আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন শিশু। পরের দুই দফা সংঘাতে বন্দর আব্বাস বারবার হামলার লক্ষ্য হলেও সরকারি ভাষ্যে অনেক ঘটনাই ‘যুদ্ধবিরতির মধ্যে স্বাভাবিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণিত। কিন্তু শহরের বাসিন্দাদের কাছে পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে আলাদা নয়।
মে মাসেও বন্দর আব্বাস ও কেশম বন্দরে মার্কিন হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তখন এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, হামলাটি ৭ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি নির্দেশ করে না। পরে জুলাইয়ের টানা হামলায় আবারও বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে বন্দরনগরটি। ২৪ জুলাই ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম শহরে একাধিক বিস্ফোরণের খবর দেয়; তার আগের রাত পর্যন্ত টানা ১৩ রাত হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী।
ছেলের জন্য প্রতিদিন নতুন ভয়
পারিসার ২৩ বছর বয়সী এক ছেলে। একক মায়ের সন্তান হওয়ায় বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। তবু স্বস্তি নেই মায়ের।
উপকূলীয় এলাকার অনেক তরুণের মতো তাঁর ছেলেও সমুদ্রে কাজ করেন। মাছ ধরার নৌকা সামরিক লক্ষ্য নয় বলে পরিবারের অন্যরা সান্ত্বনা দিলেও পারিসার ভয় কাটে না। তাঁর দাবি, সংঘাতের সময় মাছ ধরার ও বাণিজ্যিক নৌযানও হামলার শিকার হয়েছে। তাই ছেলে সমুদ্রে গেলেই ফিরে আসা পর্যন্ত উদ্বেগ।
বন্দর আব্বাস বিমানবন্দরের কাছেই তাঁদের বাড়ি। হামলার রাতে বিস্ফোরণের শব্দ কখন থামবে, তা বোঝার জন্য মাটিতে কান পেতে থাকতেন তাঁরা। সংবাদমাধ্যম রাতের হামলা শেষ হওয়ার কথা জানালেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা মিলত না। দিনের আলোতেও আবাসিক ভবনে হামলার দৃশ্য দেখেছেন বলে জানিয়েছেন পারিসা।
এখন প্রতিবেশীর দরজা জোরে বন্ধ হওয়ার শব্দেও চমকে ওঠেন তিনি। রাস্তা থেকে জোরে শব্দ এলেই মনে হয়, আবার হামলা শুরু হয়েছে।
সন্তানদের প্রশ্ন, ‘বাবা ফিরছে না কেন’
এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পারিসার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর স্বামীর মৃত্যু হয়। বন্ধুকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কোনো কথাই খুঁজে পাননি তিনি।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ওই ব্যক্তির ছোট দুই সন্তান বারবার জানতে চাইছিল, তাদের বাবা এখনও ফিরছেন না কেন। কয়েক মাস পরও শিশুরা বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়। সেই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে এখন তাদের কাছ থেকেও কিছুটা দূরে থাকেন পারিসা।
শহীদ রাজাই বন্দরে কাজ করেন তাঁর এক ভাই। আরেক ভাইয়ের কর্মস্থল হামলার হুমকিতে থাকা একটি পেট্রোরসায়নকেন্দ্র। দিনের মধ্যে বারবার ফোন করে তাঁদের খোঁজ নেন পারিসা। প্রতিটি কথোপকথনের সময় মনে হয়, এটিই হয়তো শেষবার শোনা প্রিয়জনের কণ্ঠ।
প্রতিবেশীরাই ভরসা
অবিরাম উদ্বেগের মধ্যেও বন্দর আব্বাসের মানুষের পারস্পরিক সংহতির কথা উঠে এসেছে পারিসার বয়ানে। হামলার রাতে প্রতিবেশীরা একে অন্যের খোঁজ নেন। কখনও সবাই মিলে সমুদ্রতীরে গিয়ে অপেক্ষা করেন বিস্ফোরণ থামার।
তবে পাশে মানুষ থাকলেও ভয় থেকে মুক্তি নেই। বরং যুদ্ধের ক্ষতি যত ছড়িয়েছে, ততই অসহায়ত্বের অনুভূতি।
নিজেকে ব্যস্ত রাখতে স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের একটি দলে যোগ দিয়েছেন পারিসা। যুদ্ধ ও বারবার ইন্টারনেট বন্ধের কারণে যেসব নারীর অনলাইন দোকান বা খাবারের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের সহায়তার চেষ্টা করেন তাঁরা। একটি ব্যবসা আবার চালু করতে পারলেও সাময়িক স্বস্তি। পরক্ষণেই সামনে আসে ক্ষতির বিশালতা।
শান্তির আলোচনার মধ্যেও অনিশ্চয়তা
জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রায় দুই সপ্তাহের পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ স্থগিত করে। ইরানও মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও আঞ্চলিক অবকাঠামোয় পাল্টা হামলা বন্ধের কথা জানায়। তবে হরমুজ প্রণালি তখনও বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার আলোচনায় অগ্রগতির দাবি করেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদানে মধ্যস্থতা করছে কাতার, পাকিস্তান ও ওমান। তবু হরমুজের নৌপথ, নিয়ন্ত্রণ ও মাশুলের প্রশ্নে মতভেদ রয়ে গেছে।
সেই কূটনৈতিক আশাবাদের সঙ্গে বন্দর আব্বাসের বাস্তবতার বড় ফারাক। পারিসার ভাষায়, তাঁরা জানেন না বর্তমান অবস্থাকে যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি না শান্তি–কোন নামে ডাকবেন।
নামটি জানা থাকলে অন্তত ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতো। এখন তাঁদের জীবন যেন এক অন্তহীন অপেক্ষা... সামনে দিগন্ত নেই, হাতে নিয়ন্ত্রণও নেই।




