ইরাকে ছায়া-সাম্রাজ্য ইরানের
কারা এই ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী, যাদের ভয় পায় যুক্তরাষ্ট্রও
- ৫০ হাজার যোদ্ধা, ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার, রাজনীতিতে গভীর প্রভাব– ইরাকের ভেতরে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী

২৯ জুলাই ইরাকের নিনেভেহ প্রদেশের বারতেলায় পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) একটি স্থাপনায় বিমান হামলার পর ক্ষয়ক্ষতি। ছবি: রয়টার্স
ইরাকের মাটিতে এমন কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের হাতে রয়েছে বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার, হাজার হাজার যোদ্ধা এবং দেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব। তারা একদিকে ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সময়ের হামলার পর ফের আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ইরানপন্থী এই শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের অভিযোগ, এই গোষ্ঠীগুলোর একাংশ আঞ্চলিক হামলায় যুক্ত। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে–ইরাকের ভেতরে এত শক্তিশালী হয়ে উঠল কীভাবে এই মিলিশিয়ারা?
সাদ্দামের পতনের পর শুরু নতুন অধ্যায়
২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানে ইরাকের দীর্ঘদিনের শাসক সাদ্দাম হুসেন ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তৈরি হয় বড় ধরনের শূন্যতা।
এই সময় থেকেই ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে শুরু করে ইরান। ইরানের আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সমর্থনে একাধিক শিয়া সশস্ত্র সংগঠন ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
প্রথমদিকে এদের ভূমিকা ছিল বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ। পরে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর উত্থানের সময় তারা নিজেদের ‘প্রতিরোধ বাহিনী’ হিসেবে তুলে ধরে।
সেনাবাহিনীর সমান অস্ত্রশক্তি
ইরানের ঘনিষ্ঠ এই সংগঠনগুলোর একটি বড় অংশ ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ নামে পরিচিত জোটের সঙ্গে যুক্ত। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই জোটের অধীনে প্রায় ১০টি কট্টরপন্থী শিয়া সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে। তাদের সম্মিলিত যোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার বলে ধারণা করা হয়। তাদের কাছে রয়েছে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, রকেট ব্যবস্থা ও বিমান প্রতিরোধী অস্ত্র৷ এই অস্ত্রভাণ্ডারের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তারা ইরাকি সেনাবাহিনীর সমতুল্য শক্তি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে।
শুধু বন্দুক নয়, রাজনীতিতেও শক্ত অবস্থান
এই মিলিশিয়াদের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ইরাকের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও তারা গভীরভাবে যুক্ত। তাদের সদস্যরা সংসদে আসন পেয়েছেন, সরকারি পদে থেকেছেন এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। ফলে ইরাকের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেও তাদের প্রভাব রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটাই ইরাক সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ–কীভাবে এমন শক্তিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যারা একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা ধরে রেখেছে।
গাজা যুদ্ধের পর ফের সক্রিয়
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই গোষ্ঠীগুলো ফের আলোচনায় আসে।
‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ দাবি করে, তারা ইসরায়েল এবং ইরাক ও সিরিয়ায় থাকা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে শক্তিশালী কাতাইব হিজবুল্লাহ
ইরাকের ইরানপন্থী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত কাতাইব হিজবুল্লাহ।
২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আবু মাহদি আল-মুহান্দিস এই সংগঠনটি তৈরি করেন। ২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। একই হামলায় ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেইমানিও নিহত হন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি মার্কিন সেনা ও কূটনৈতিক স্থাপনার বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগে আলোচিত হয়। স্নাইপার হামলা, রকেট, মর্টার এবং রাস্তার পাশে বিস্ফোরক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা ১০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তাদের কাছে ড্রোন, রকেট এবং স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র অতীতে একাধিকবার তাদের ঘাঁটি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু সংগঠনটি মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।
আসাইব আহল আল-হক : বন্দুক থেকে রাজনীতির পথে
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হলো আসাইব আহল আল-হক। এর নেতৃত্বে রয়েছেন কায়েস আল-খাজালি।
১৯৭৪ সালে বাগদাদের সদর সিটিতে জন্ম নেওয়া খাজালি মার্কিন আগ্রাসনের পরবর্তী অস্থির সময়ে পরিচিতি লাভ করেন। ২০০৭ সালে কারবালায় মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রায় তিন বছর মার্কিন কারাগারে থাকার পর তিনি মুক্তি পান।
পরে তিনি আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেন এবং ধীরে ধীরে ইরাকের রাজনীতিতেও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
সাম্প্রতিক সময়ে খাজালি নিজেকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা থেকে দূরত্ব বজায় রাখার বার্তাও দিয়েছেন।
অস্ত্র ছাড়বে কি মিলিশিয়ারা?
ইরাক সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন : এই শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোকে কীভাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করা এবং সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
কিছু সংগঠন অস্ত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও কাতাইব হিজবুল্লাহ, কাতাইব সাইয়্যিদ আল-শুহাদা এবং হারাকাত হিজবুল্লাহ আল-নুজাবার মতো শক্তিশালী সংগঠন এখনো নিরস্ত্রীকরণের বিরোধিতা করছে।
ইরাকের সামনে বড় পরীক্ষা
আজকের ইরাকে এই মিলিশিয়ারা একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও সংকট–দুই-ই।
আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের স্বাধীন সামরিক শক্তি, বিদেশি প্রভাব এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ইরাকের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাগদাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন এখন একটাই– রাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত বন্দুকের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে ফিরিয়ে নিতে পারবে, নাকি ইরাকের ভেতরে এই ‘ছায়া-সাম্রাজ্য’ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে?




