আধুনিক প্রযুক্তি আর ১ কোটি দেশীয় বীজ
মরুভূমিকে আবার সবুজ করতে আবুধাবির নজিরবিহীন উদ্যোগ

সংগৃহীত ছবি
মরুভূমি মানেই অনন্ত বালুরাশি, রৌদ্র তপ্ত হাওয়া আর জীবনের অনুপস্থিতি, এই চিরচেনা ধারণাকেই বদলে দিতে চাইছে আবুধাবি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ ড্রোন, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং ১ কোটি দেশি উদ্ভিদের বীজকে সঙ্গী করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানীতে শুরু করতে চলেছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ পরিবেশ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি। লক্ষ্য শুধু সবুজ ফিরিয়ে আনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও মরুকরণের বিরুদ্ধে মরুভূমিকেই নতুন করে বাঁচিয়ে তোলা।
২ আগস্ট অর্থাৎ রবিবার ঘোষণা করা এই কর্মসূচিতে আকাশপথে ১ কোটি দেশি উদ্ভিদের বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হবে। সবুজ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি মরুভূমির ক্ষয়িষ্ণু বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। এই প্রকল্প পরিচালনা করছে এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি আবুধাবি (ইএডি)। সংস্থার প্ল্যান্ট জেনেটিক রিসোর্স সেন্টারের বিশেষজ্ঞ হাসান আলি আল আহবাবি জানান যে, মরুভূমির প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ফিরিয়ে আনা এবং স্থলভাগের পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করাই এ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্যমাত্রা। বিশাল এলাকা জুড়ে দ্রুত বীজ ছড়াতে ব্যবহার করা হবে আধুনিক আকাশপথ প্রযুক্তি। এই কর্মসূচিতে শুধু দেশীয় উদ্ভিদেরই বীজ ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ঘাফ, সামার, আরতা, শোয়া, রাঘাল এবং থামাম প্রজাতির উদ্ভিদ এর বীজ। মাটির ধরন, লবণাক্ততা ও বিদ্যমান উদ্ভিদের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিটি এলাকায় আলাদা আলাদা প্রজাতির বীজ ছড়ানো হবে। যাতে অঙ্কুরোদগমের সম্ভাবনা সর্বাধিক থাকে।
বীজ ছড়ানোর জন্য নির্ধারিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে আল শুয়াইইব, সুইহান, নাহিল, আল হায়ের, আল রাওদাহ। পাশাপাশি আল ঘাদা নেচার রিজার্ভ এবং আল ধাফরার হৌবারা সংরক্ষিত অঞ্চলেও বীজ ছড়ানো হবে। পুরো প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট চিত্র, রিমোট সেন্সিং, জিওস্পেশিয়াল তথ্য এবং এনডিভিআই ও এসএভিআই মতো সূচকের সাহায্যে কোথায় বীজ ছড়ালে সবচেয়ে বেশি ফল মিলবে তা নির্ধারণ করা হবে। যদিও বীজ ছড়ানোর পরও কাজ শেষ হবে না কারণ আগামী দুই বছর ধরে মাঠপর্যায়ের নিবিড় সমীক্ষা এবং ড্রোনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে অঙ্কুরোদগম, উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে মরুভূমির প্রধান সমস্যা হলো কম বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বালুর আগ্রাসন। এ ছাড়া এত বড় এলাকায় হাতে গাছ লাগানো সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। তাই বিমান ও ড্রোনের সাহায্যে আকাশপথে বীজ ছড়ানোকে দ্রুত, কম ব্যয়বহুল এবং কার্যকর বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। বীজ ছড়ানোর আগে সেগুলো সংগ্রহ, পরিষ্কার করা, পরীক্ষাগারে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি বিশেষ সিড পেলেটের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে। এই পেলেট আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করবে, পাখির হাত থেকে বীজ রক্ষা করবে এবং গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিও সরবরাহ করবে। প্রকল্প সফল হলে মরুভূমিতে দেশীয় উদ্ভিদের বিস্তার বাড়বে। তেমনি আবার মাটির ক্ষয় ও মরুকরণ কমবে, বালুঝড়ের প্রকোপ হ্রাস পাবে, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল শক্তিশালী হবে এবং বায়ুমণ্ডল থেকে আরও বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ সম্ভব হবে। আবুধাবির আশা, বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর এই উদ্যোগ আগামীতে মরুভূমির বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গোটা অঞ্চলের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠবে।
ভাষান্তর - রুবাইয়া জেসমিন




