ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মেয়াদ ফুরোচ্ছে, এখন কী হবে

ইরানের তেহরানের একটি রাস্তায় যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ। ছবি : রয়টার্স
ফেব্রুয়ারি থেকে যে লড়াই চলছিল তা থামাতে সমঝোতা করেছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সেই সমঝোতার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। কিন্তু লড়াই থামার আশা সুদূর পরাহত।
থেমে থেমে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে চলছে যুদ্ধ। হুমকি-পাল্টা হুমকিও চলছে সমানে। দুই দেশের নেতাদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে আগ্রাসী কথা। কোনো পক্ষের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে না এই সমঝোতার মেয়াদ বৃদ্ধি করার আগ্রহ।
আলোচনায় ইরানের অনাগ্রহের কথা গত শনিবার জানিয়েছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তার টেলিগ্রামে এক পোস্টে বলা হয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরুর বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
তবে মধ্যস্থতা করতে চাওয়া দেশ কাতার ও পাকিস্তান থেমে নেই। দেশ দুটির কর্মকর্তারা আলাপ করেছেন ইরানিদের সঙ্গে। তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার চেয়ে হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্য নিশ্চিত করতেই বেশি আগ্রহী। সেজন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ওমানের সঙ্গে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন, হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা দিতে। এই অবস্থায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ যে নতুন পর্যায়ে পৌঁছাবে তা এক প্রকার নিশ্চিত।
সমঝোতায় কী ছিল
জুনের ১৭ তারিখ সই হয়েছিল এই সমঝোতা স্মারক। পাকিস্তান করেছিল মধ্যস্থতা। এতে ইরানের হয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সই করেছিলেন।
সে সময় এই সমঝোতা বড় ধরনের সুখবর হয়ে এসেছিল। যুদ্ধ শেষ করাই ছিল এর একমাত্র লক্ষ্য। শুধু তেহরানে নয়, লেবাননেও বোমাবাজি থামানোর জন্য করা হয়েছিল এই সমঝোতা। তখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো রেখে দেওয়া হয়েছিল পরবর্তী সময়ের জন্য। তখন আশা দেখা দিয়েছিল বোমায় মানুষের মৃত্যু থামবে। উপসাগরে ফের চলবে বাণিজ্যিক জাহাজ। যে জলপথের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক পঞ্চমাংশ।
চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানের স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করছে। একইসঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তি সব রণাঙ্গনে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি নিশ্চিত করবে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, এই চূড়ান্ত চুক্তিটি অনুমোদিত হবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক।
এ চুক্তি সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে, বলা হয়েছিল সমঝোতায়। এতে আরও বলা হয়েছিল, পারস্পরিক সম্মতিতে চাইলে এই মেয়াদ আরও বাড়ানোও যেতে পারে। কিন্তু আজ ১৭ আগস্ট দুই মাস শেষে এই সমঝোতার মেয়াদ আর বাড়বে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ওই সমঝোতায় আরও ছিল, যুক্তরাষ্ট্রকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে তার নৌ অবরোধ। আর ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ হওয়ার পর তার বাহিনী সরিয়ে নিতে হবে ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে। ইরানের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন প্যাকেজের কাজ শুরু করতে হবে।
ওয়াশিংটন ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে, ইরানের তেল রপ্তানিতে ছাড় দিতে এবং তেহরানকে জব্দ তহবিল ব্যবহারের অনুমতি দিতেও সম্মত হয়েছিল।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী থেকে মাইন অপসারণ করার কথা ছিল ইরানের। হরমুজে ৬০ দিনের জন্য ‘বিনা মূল্যে’ জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথা ছিল দেশটির।
তেহরান এও বলেছিল, তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে না এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে।
সমঝোতা কতটা সফল ছিল
সমঝোতা সই হওয়ার পর থেকেই এটি নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। এটি একটি যুদ্ধবিরতি ছিল নাকি একটি স্থায়ী চুক্তি এবং উভয় পক্ষের কী করার কথা ছিল— তা নিয়ে চলতে থাকে তর্ক।
এই তর্কের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের হামলাকে ট্রাম্প চুক্তির ‘একটি নির্বোধ লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে ইরান বলেছিল, যে মার্কিন হামলা ‘সমঝোতা স্মারকের এক নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে’।
পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন, চুক্তিটি শেষ হয়ে গেছে। এই ঘোষণার পর কার্যত যুদ্ধ আবার শুরু হয়ে যায়।
সমঝোতার মেয়াদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেয়নি। পুনর্গঠনের জন্য ইরানকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও উপহাস করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টিও বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ ইরান ও মার্কিন কর্মকর্তারা প্রণালিটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করে চলেছেন। এই জলপথে প্রায়ই আক্রান্ত হচ্ছে জাহাজ।
তেহরানের ফলিত বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশমের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্তাবলী বা সমঝোতা স্মারকটি মেনে না চলায় যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে।
এই অধ্যাপকের মতে, তেহরান মনে করে, ইরানের সম্পদ হস্তান্তর, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ।
‘এখন আনুষ্ঠানিকভাবে, কাগজে-কলমে বলা হচ্ছে যে, সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে’, যোগ করেন খোশচেশম।
এখন কী ঘটতে পারে
যদিও আজ সমঝোতার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে, তবে এর সঠিক অর্থ কী, তা নির্ভর করে আপনি কোন পক্ষকে জিজ্ঞাসা করছেন তার ওপর।
ইরানের স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি (আইএসএনএ)-এর তথ্যমতে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত শুক্রবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকটি লঙ্ঘন করেছে এবং হামলা অব্যাহত রেখেছে। ফলে এটি এমন কোনো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ছিল না যার মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল।
সম্প্রতি রদবদল হয়েছে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। এতে ভবিষ্যতের আলোচনায় তেহরান যে আরও কঠোর অবস্থান নেবে তা স্পষ্ট। একইসঙ্গে হরমুজের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে দেশটি বিন্দুমাত্র পিছু হটবে বলে মনে হচ্ছে না।
এই মাসের শুরুতে, আইআরজিসির সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাইকে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের অর্থ হলো—সামরিক ও বেসামরিক কার্যক্রমের মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় করা।
খোশচেশমের ভাষ্য, রেজাইয়ের এই নিয়োগ এবং সাম্প্রতিক অন্যান্য নেতৃত্বের পরিবর্তন এটাই প্রমাণ করে যে, ইরান মনে করে তাদের পাল্লা ভারী।
‘যেকোনো নতুন আলোচনায় ইরান সম্ভবত আরও কিছু দাবি নিয়ে আলোচনায় বসবে’, যোগ করেন এই গবেষক।
এরমধ্যে এমন বিষয় থাকতে পারে যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এ গবেষক মনে করেন, গাজায় যুদ্ধ শেষ করা, ইয়েমেনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইসরায়েলের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান হয়তো তেহরান জানাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আর বেশি কিছু নেই
যুদ্ধে সুবিধা করতে না পারলেও কথায় পিছিয়ে নেই ট্রাম্প। প্রতিদিনই নতুন নতুন হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন তিনি এবং তার প্রশাসনের কর্তারা। গত শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘ইরানকে পরাজিত করার পর শিগগির আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করব।’
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও শুক্রবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর এমন পদক্ষেপ নেবে যা কখনো দেখা যায়নি।
তবে এমন হুমকিতেও কোনো হেলদুল নেই ইরানের। বিশ্লেষকরা যদিও মনে করছেন, ইরানকে চাপে ফেলতে ট্রাম্পের হাতে খুব বেশি ‘অস্ত্র’ অবশিষ্ট নেই।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের ডিস্টিংগুইশড ফেলো বারবারা স্লাভিন বলেছেন, তেহরানের ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করতে চাইলে ট্রাম্পের হাতে খুব বেশি উপায় অবশিষ্ট নেই।
স্টিমসন সেন্টারের এই গবেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুদ কমে গেছে। নিঃশেষ হয়ে গেছে কৌশলগত তেলের ভান্ডার। বিমানবাহী রণতরীসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সমুদ্রে পড়ে আছে পরিকল্পনার চেয়ে কয়েক মাস বেশি সময় ধরে। এসবের অর্থ হলো— যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চেষ্টা করার মতো সামরিক বিকল্প খুব কমই অবশিষ্ট আছে।
অর্থনৈতিক চাপের বিষয়ে স্লাভিন বললেন, তেহরান দেখিয়েছে যে, তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে নিজেরাই অর্থনৈতিক ক্ষতি করতে পারে। ইরান এখানে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি পূরণ না করায় তারা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ। তারা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে নাড়া দিচ্ছে। অন্যদিকে বেকায়দায় পড়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
স্লাভিনের মতে, যেভাবেই হোক, ইরান সম্ভবত এই যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ পাবে। ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ লাভ করবে হরমুজ প্রণালির ওপর ।
এই গবেষকের ভবিষ্যদ্বাণী, সংঘাত খুব সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরে একটি চুক্তির মাধ্যমে শেষ হবে।
যদিও সমঝোতা থেকেই বিজয় খুঁজে পেয়েছে বলে দাবি ইরানের। সেই ইঙ্গিতই মিলেছে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ কালিবাফের কথায়। তিনি শনিবার তেহরানে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সমঝোতা স্মারকে ইরান যে ছাড়গুলো আদায় করেছে তা গর্ব ও বিজয়ের উৎস। আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে আমরা এই যুদ্ধে সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই সত্যিকারের বিজয়ী হয়েছি।’
আলজাজিরা অবলম্বনে








