হামাসের নতুন নেতা কে এই খলিল আল-হাইয়া
- চলমান ইসরায়েলি গুপ্তহত্যা অভিযানের মধ্যেই গোপন নির্বাচন অনুষ্ঠিত
- প্রবীণ নেতা খালেদ মেশালকে পরাজিত;
- গাজায় যুদ্ধবিরতি আলোচক দলের প্রধান
- আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন
- পাঁচ সদস্যের নেতৃত্ব পরিষদ ভেঙে দেওয়া হবে
- আল-কাসাম ব্রিগেড পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছে

ইসরায়েলের সঙ্গে পরোক্ষ যুদ্ধবিরতি আলোচনায় সংগঠনটির প্রধান আলোচক খলিল আল-হাইয়াকে নতুন রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করার কথা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাস।
ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির আলোকে গাজার শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের কয়েকদিন পরেই নতুন নেতা নির্বাচনের ঘোষণা দিল সশস্ত্র সংগঠনটি।
স্থানীয় সময় সোমবার হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন (হামাস) ঘোষণা করছে, শহীদ নেতা ইয়াহিয়া আল-সিনওয়ারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ভাই মুজাহিদ খলিল আল-হাইয়াকে আন্দোলনের রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধান নির্বাচিত করা হয়েছে।’
কয়েক মাস ধরে হামাসের এই অভিজ্ঞ নেতা গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়াহিয়া সিনওয়ারের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে সিনওয়ারকে অভিযুক্ত করেছিল ইসরায়েল। এক বছর পর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে তিনি নিহত হন।
নেতৃত্বের এ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাবেক হামাস প্রধান ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ নেতা খালেদ মেশালকে পরাজিত করেন আল-হাইয়া।
হামাসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘খলিল আল-হাইয়া বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত হয়েছেন।’ নতুন প্রধান আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামাসের এক সূত্র জানায়, ভোটগ্রহণে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। ওই সূত্রের ভাষ্য, ‘কঠিন নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দখলদারদের হাতে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতার হত্যার কারণে অত্যন্ত জটিল ও গোপনীয় প্রক্রিয়ায় নির্বাচনটি সম্পন্ন করা হয়েছে।’
সিনওয়ারের মৃত্যুর পর থেকে হামাস পাঁচ সদস্যের একটি নেতৃত্ব পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। এই পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ দারবিশ।
হামাসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিষদটি শিগগির বিলুপ্ত করা হবে এবং এর সদস্যরা সংগঠনটির শুরা কাউন্সিলের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, ‘কয়েক দিনের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যুরো ইস্তাম্বুলে বৈঠক করবে। সেখানে কমিটি গঠন এবং হামাসের নেতৃত্ব কাঠামোর পুনর্গঠন শুরু হবে।’
হামাসের সশস্ত্র শাখা ইজ্জেদিন আল-কাসাম ব্রিগেডের প্রতিনিধিরাও আল-হাইয়ার প্রতি ‘পূর্ণ সমর্থন’ ঘোষণা করেছেন।
হামাসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আল-হাইয়াকে অনেকেই মধ্যপন্থী হিসেবে দেখেন। কাতার ও তুরস্ক থেকে এই নেতা হামাসের নেতৃত্ব দেবেন। ক্ষমতা ছাড়লেও হামাস এখনো বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। পাশাপাশি এ উপত্যকায় হাজারো যোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত একটি নিরাপত্তা কাঠামোও রয়েছে।
কাতারের রাজধানী দোহা হামাসের অনানুষ্ঠানিক ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। সেখান থেকে সংগঠনটি আরব ও ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।
আল-হাইয়ার ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লেবাননের হিজবুল্লাহ, কাতার, মিসর ও আলজেরিয়ার মতো আরব দেশগুলোর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে।
তার বাস্তববাদী ও রক্ষণশীল মানসিকতার কথা তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘তিনি সহজে আবেগতাড়িত হন না এবং রাজনৈতিক ব্যুরোর সব সদস্যের পাশাপাশি সামরিক কমান্ডারদের কাছেও তিনি সম্মানিত।’
১৯৬০ সালে জন্ম নেওয়া আল-হাইয়া গাজার একটি ধর্মীয় ও রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠেন। পরে তিনি ওই অঞ্চলের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর জর্ডানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সুদানে ইসলামি আইনে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি ইসরায়েলের কারাগারে তিন বছর কাটান।
২০০৬ সালে হামাস নির্বাচনে জয়লাভের পর আল-হাইয়া সংগঠনটির সংসদীয় ব্লকের নেতৃত্ব দেন। পরবর্তী মাসগুলোতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিরোধ দেখা দেয়। এর মধ্য দিয়েই ইসলামপন্থী সংগঠন হামাস এবং ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের দল ফাতাহর মধ্যে বিভেদের সূচনা হয়।
সশস্ত্র সংগ্রামের গুরুত্বের ওপর বারবার জোর দেওয়া আল-হাইয়া ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি হত্যাচেষ্টা থেকে বেচে গেছেন। এর মধ্যে ২০০৭ ও ২০১৪ সালের হত্যাচেষ্টাও রয়েছে। ২০০৭ সালে উত্তর গাজা উপত্যকায় তার বাড়ি লক্ষ্য করে একটি সামরিক অভিযান চালানো হয়। এতে তার স্ত্রী ও তিন সন্তান নিহত হন।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দোহায় ইসরায়েলি হামলা থেকেও তিনি ও মেশাল বেঁচে যান। ওই হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে আল-হাইয়ার এক ছেলে ও তার চিফ অব স্টাফও ছিলেন।
সূত্র : ডন




