সৌদিতে হামলা, সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর ব্যর্থতা প্রকাশ্যে

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি। ফাইল ছবি / রয়টার্স
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার ঘটনায় ইরাকের ভেতরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার ইরাকের ভূখণ্ড থেকে চালানো ওই হামলায় পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয় এবং ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। পাইপলাইনটি সৌদি আরবের মোট তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ পরিবহন করে।
হামলার দায় এখনো কোনো গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। ইরাকের ইরানপন্থী কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, হামলাটি তারা চালালে সেটি নিয়ে গর্ব করত, কিন্তু এর দায় তারা নিচ্ছে না।
ইরাক সরকার জানিয়েছে, ড্রোনগুলো ইরাকের ভূখণ্ড থেকেই উড়েছিল। শনিবার দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ইরানের সীমান্তবর্তী মায়সান প্রদেশের আল-তাইয়েব এলাকায় দুয়াইরিজ নদীর কাছে ড্রোন উৎক্ষেপণের চিহ্ন শনাক্ত করে। নিরাপত্তা বাহিনী একটি উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মও জব্দ করেছে।
ইরাকের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, হামলার পেছনে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন অংশ থাকতে পারে। তবে এ তথ্য এখনো নিশ্চিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হরাইজন এনগেজের গবেষক মাইকেল নাইটসও বলেছেন, হামলার দায় এড়াতে কোনো ‘ছায়া গোষ্ঠী’-কে সামনে আনার কৌশল নতুন নয়। তার ধারণা, হামলার পেছনে সরাসরি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) অথবা ইরাকের কোনো প্রতিষ্ঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা থাকতে পারেন।
হামলার পর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি। তিনি মায়সান প্রদেশের অপারেশনস কমান্ডারকে বরখাস্ত করেছেন এবং ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। হামলাকারীরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য ইরান সীমান্তের কয়েকটি স্থলবন্দরও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মায়সানের বিভিন্ন এলাকায় সাঁজোয়া যান ও ভারী অস্ত্রসহ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
ইরাকের ভূখণ্ড থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। জুলাইয়েও ইরাক থেকে উড়ে যাওয়া ড্রোন সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। ইরাকে থাকা হুতি যোদ্ধাদের সহযোগিতায় ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব হামলা চালায়। এতে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা পিএমএফের ২০ জনের বেশি সদস্য নিহত হন। তাদের মধ্যে ইরানের সামরিক উপদেষ্টাও ছিলেন। এর পর সৃষ্ট কূটনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জায়েদির নির্ধারিত রিয়াদ সফর পিছিয়ে যায়।
নতুন হামলার ঘটনায় ইরাক ও সৌদি আরবের সাম্প্রতিক উষ্ণ হয়ে ওঠা সম্পর্কও চাপের মুখে পড়েছে। ১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করার পর সৌদি আরব ইরাকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থগিত করেছিল। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের উত্থানের পর দুই দেশের যোগাযোগ আবার বাড়ে।
২০২০ সালে দুই দেশের সীমান্ত পারাপারের পথগুলো আবার চালু হয়। এরপর বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ সংযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে সহযোগিতার আলোচনা এগোয়। চলতি মাসে সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান খালিদ আল-হুমাইদান বাগদাদ সফর করেন। ১০ সেপ্টেম্বরের হামলার পরও ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সৌদি আরব এখন পর্যন্ত পাল্টা হামলা চালায়নি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের উপপরিচালক লাহিব হিগেল বলেছেন, হামলাটি জায়েদিকে দেওয়া একটি বার্তাও হতে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ইরাকের অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করার চেষ্টা করছেন জায়েদি। ইরানপন্থী কিছু গোষ্ঠী অবশ্য সৌদি হামলায় নিহত তাদের সদস্যদের প্রতিশোধকে ব্যবসায়িক চুক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
ইরান ও এর সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলোও ইরাকের অর্থনীতি যেন তেহরানের ওপর কম নির্ভরশীল না হয়, তা চাইতে পারে না বলে মনে করেন হিগেল। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির বাইরে বিকল্প তেল রপ্তানি পথ তৈরি হওয়াও এসব গোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।
প্রতিবেশী দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছেন জায়েদি। আগস্টে তিনি ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে ইরাকে স্বাগত জানান। এর প্রায় এক মাস আগে তিনি তেহরান সফর করে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলে আসছেন জায়েদি। তিনি ইরাকের ব্যাংকগুলোকে লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সংসদকে আইন তৈরির অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচার করা হবে।
তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বারবার বাধা এসেছে। জুলাইয়ে বাগদাদের দক্ষিণে হারাকাত আল-নুজাবার একটি স্থাপনায় তল্লাশি চালাতে যাওয়া ইরাকি সেনাদের সতর্কতামূলক গুলি ছুড়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আগস্টে সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী নুজাবার জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আব্বাস আল-ইয়াকুবিকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একজন বিচারক তাকে মুক্তি দেন।
তবে বাগদাদের একটি আদালত কাতাইব হিজবুল্লাহর এক সদস্যকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। গত মার্চে মার্কিন সাংবাদিক শেলি কিটলসনকে অপহরণের ঘটনায় ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই সাজা দেওয়া হয়।
হিগেল বলেছেন, আগের প্রধানমন্ত্রীদের তুলনায় জায়েদি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বেশি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। এমন রায় নিম্নপর্যায়ের যোদ্ধাদেরও ভাবতে বাধ্য করতে পারে, কোনো অভিযানে অংশ নিয়ে ১৫ বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত। তবে সামগ্রিকভাবে এতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর বড় কোনো প্রভাব পড়েনি বলেও তিনি মনে করেন।
কাতাইব হিজবুল্লাহ, নুজাবা ও কাতাইব সাইয়্যিদ আল-শুহাদা—এই তিনটি গোষ্ঠী এখনো অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ইরাকের রাজনীতি পর্যবেক্ষণকারী অনেকেই মনে করেন, এসব গোষ্ঠী বড় কোনো ছাড় দেবে না। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার ইচ্ছাও সরকারের মধ্যে এখনো দেখা যাচ্ছে না।
গবেষক মাইকেল নাইটসের মতে, সমস্যা শুধু ইরাকি সরকারের সামরিক সক্ষমতার নয়, রাজনৈতিকভাবে কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস আছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, সৌদি আরবে হামলা চালানোই ছিল এমন একটি পদক্ষেপ, যা যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি আবার ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতাদের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারত। তারপরও হামলা চালানো হয়েছে।
নাইটস বলেছেন, ইরাকের সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনীর বেশির ভাগ সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতাকে দমন করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে এর জন্য ইরাকের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন।
ইরাকের অনেক কর্মকর্তারই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে আস্থা কমেছে। ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চাইলেও সেই সহায়তা প্রত্যাশামতো পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাগদাদের সুরক্ষিত সরকারি এলাকা গ্রিন জোন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবরোধের মুখে পড়লে ওয়াশিংটন ইরাকের পাশে দাঁড়াবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
এদিকে ইরাকে থাকা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের শেষ সেনারা ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটি ছাড়ার কথা রয়েছে। এর পর ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
হিগেলের মতে, এসব গোষ্ঠী মনে করছে সময় তাদের পক্ষেই আছে এবং তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে। তার মতে, জায়েদির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো ওয়াশিংটন ও রিয়াদকে সন্তুষ্ট রাখার মতো দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া, আবার এমন কোনো সংঘাত এড়িয়ে চলা, যা তার সরকারকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
সূত্র : আলজাজিরা








