সস্তাযুদ্ধে সৌদির দামী অসহায়তা
কোটি ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র রুখছে হুতিদের গাধার পিঠে বন্দুক

বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে হুতিদের অস্ত্র, অর্থ ও কৌশলগত সহায়তায় তেহরানের ভূমিকার কথা এসেছে; যদিও ইরান সরাসরি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ছবি : সংগৃহীত
সৌদির এখন মহাবিপদকাল। এমন বিপদ, যেখানে ঘরের ভেতরে টাকা আর অস্ত্রের পাহাড় জমিয়েও রাতের ঘুমের গ্যারান্টি নেই। দামি যুদ্ধবিমান আছে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা আছে, শক্তিশালী বন্ধু আছে, নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিও আছে—শুধু নিশ্চিন্ত থাকার জিনিসটি যেন রাজমসনদের তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে।
একসময় তেলের অর্থ আর ধর্মীয় প্রভাব ছিল সৌদি আরবের দুই শক্ত হাত। এক হাতে ডলার, আরেক হাতে সালাফি মতবাদ। শীতলযুদ্ধের পৃথিবীতে এই দুই হাত বেশ সক্রিয় ছিল। রিয়াদের অর্থে ছড়িয়ে পড়া রক্ষণশীল ধর্মীয় নেটওয়ার্ক আর সোভিয়েতবিরোধী মার্কিন ভূরাজনীতি এশিয়া ও আফ্রিকার বহু জায়গায় পাশাপাশি হেঁটেছে।
বাংলাদেশেও আশির দশকে এমন মানুষ দেখা গেছে, যারা লুঙ্গি-পুঁটলি নিয়ে সৌদি গিয়ে কয়েক বছর পর ফিরেছেন সৌদি পাগড়ি-আলখাল্লা পরে, সঙ্গে কচকচে নতুন টাকার বান্ডিল। তারা ধর্মীয় মোড়কে নতুন মতবাদ প্রচার করেছেন; টাকা কথা বলেছে, চা-বিস্কুটের টেবিলে এদেশের শ্রোতা সবসময়ই বেশি।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব ধরে রাখা, ইরানের প্রভাব ঠেকানো এবং আঞ্চলিক কর্তৃত্ব বাড়াতেও সৌদি অর্থ ও মতবাদ ব্যবহৃত হয়েছে। তখন তেল শুধু গাড়ি চালাত না, মতবাদও চালাত। অর্থের বড় সুবিধা—সে অনেক দূর যায়। অসুবিধা হলো, তার প্রতিক্রিয়াও কখনো অনেক দূর ঘুরে বাড়ির দরজায় ফিরে আসে মহাদূর্যোগ নিয়ে। সৌদি মসনদ এখন সেই মহাদূর্যোগ মোকাবেলায় হিমসিম খাচ্ছে।
সৌদির জন্য যুদ্ধের আরেকটি নির্মম দিক হলো খরচের অনুপাত। একটি সস্তা ড্রোন ঠেকাতে যে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, তার দাম কখনো আক্রমণকারী ড্রোনের দামের বহু গুণ।
সৌদির দক্ষিণ সীমান্তের ওপারে উত্তর ইয়েমেনের সা’দা বহু শতাব্দী ধরে জায়দি সমাজের ঐতিহাসিক কেন্দ্র। সেখানে সৌদি অর্থপুষ্ট সালাফি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বাড়তে শুরু করলে স্থানীয় জায়দিদের একটি অংশ বিষয়টিকে নিছক ধর্মপ্রচার হিসেবে নেয়নি। তাদের কানে বার্তাটি যেন এমন শোনায়—তোমাদের এত দিনের ধর্মচর্চা যথেষ্ট ঠিক নয়; নামাজ এভাবে পড়ো, হাত এখানে রাখো, দাড়ি ও আকিদা এভাবে মানো।
একসময় ধর্মের চেয়ে নিয়মের তালিকাই বড় হয়ে উঠল। রিয়াদ ভাবছিল প্রভাবের মানচিত্রে রং লাগাচ্ছে; সা’দার মানুষ ভাবল, আমাদের ঘরের দেয়ালে অন্যের রং কেন?
ধর্মীয় অস্বস্তি বেশিদিন ধর্মের ঘরে বসে থাকে না। দ্রুত রাজনীতির বসার ঘরে ঢোকে। তার সঙ্গে যোগ হয় বঞ্চনা, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিদেশি প্রভাবের ভয়। হুসেইন আল-হুতি ও তাঁর সহযোগীরা সেই ক্ষোভকে সংগঠিত ভাষা দিলেন। প্রথমে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় রক্ষার আন্দোলন, পরে তার সঙ্গে জুড়ল দুর্নীতিবিরোধিতা, সা’দার বঞ্চনা, সৌদি ও আমেরিকান প্রভাবের বিরোধিতা।
আজ সেই আগুনই সৌদির ঘাড়ের কাছে। অবস্থা এমন—সামনের দরজায় ডাকাত, পেছনের দরজায় আগুন। পূর্বদিকে হরমুজ প্রণালি, যেখানে ইরান আমেরিকা সংঘাত জাহাজ চলাচলকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। পশ্চিমদিকে বাব আল-মান্দাব, যেখানে হুতিদের অগ্রযাত্রা সৌদি-সমর্থিত শক্তিকে চাপে ফেলেছে। মাঝখানে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন—হরমুজ এড়িয়ে তেল পশ্চিম উপকূলে নেওয়ার বিকল্প পথ—সেটিও হামলায় পড়ে বন্ধ হয়েছে।
অর্থাৎ সংসারের চাল-ডালের টাকা যে তেল থেকে আসে, তার এক দরজায় ইরান, আরেক দরজায় হুতি, মাঝের করিডরেও ধোঁয়া। অথচ সৌদি শাহীর রাজদরবারে অস্ত্রের পাহাড়। সিপ্রির হিসাবে ২০২৫ সালে সৌদি আরব সামরিক খাতে প্রায় ৮৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এফ-১৫ আছে, ইউরোফাইটার আছে, প্যাট্রিয়ট আছে, থাড আছে, আধুনিক রাডার আছে। অস্ত্রের নাম বলতে বলতে সাধারণ মানুষের দম ফুরিয়ে যাবে; রিয়াদের তালিকা তখনও শেষ হবে না।
তবু সমস্যা রয়ে গেছে। কারণ যে অস্ত্র নিয়ে সৌদি যুদ্ধে নেমেছে, হুতিরা সেই যুদ্ধটাই করছে না। সৌদি সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র ধরনের যুদ্ধের জন্য তৈরি—শত্রুর বিমানঘাঁটি থাকবে, ট্যাংকের সারি থাকবে, রাডার থাকবে, বড় সেনা কলাম থাকবে; স্যাটেলাইটে দেখা যাবে, লক্ষ্য শনাক্ত হবে, যুদ্ধবিমান গিয়ে আঘাত করবে। কিন্তু হুতি সেই ডিসিপ্লিনড শত্রু নয়।
তাদের বিমান নেই, রানওয়ে নেই, সার দিয়ে দাঁড়ানো ট্যাংকও নেই। আছে মোবাইল লঞ্চার, পাহাড়, গুহা, দ্রুত জায়গা বদলের অভ্যাস। আজ এক উপত্যকা, কাল অন্য পাহাড়। সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়, গাধার পিঠে অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান বসিয়েও তারা যুদ্ধ করছে। এখন একটি গাধা, একটি লঞ্চার বা একটি সস্তা ড্রোন থামাতে যদি কোটি ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হয়, সেটি শুধু অর্থের অপচয় নয়; আধুনিক অস্ত্রবাজারের জন্যও একধরনের অস্বস্তি। মশা মারতে কামান দাগার যে প্রবাদ, ইয়েমেনে তার সামরিক সংস্করণ চলছে।
আইআইএসএস ইয়েমেন যুদ্ধ বিশ্লেষণে দেখিয়েছে, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান থাকলেও সৌদি বাহিনী নগর ও বিদ্রোহী যুদ্ধে লক্ষ্য শনাক্তকরণ, গোয়েন্দা তথ্য, লক্ষ্য যাচাই ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞতায় দুর্বল ছিল। সহজ কথায়—দোকান থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ছুরি কেনা যায়, সার্জনের হাত নয়।
সব মিলিয়ে সৌদির বিপদ শুধু হুতি নয়। বিপদ তার বহুদিনের একটি বিশ্বাসে—টাকা থাকলে শক্তি কেনা যায়, অস্ত্র থাকলে নিরাপত্তা কেনা যায়, আর বন্ধু থাকলে যুদ্ধের দিনে সবাই এসে পাশে দাঁড়ায়। বাস্তবতা হলো, টাকা থাকলে অনেক কিছু কেনা যায়; শুধু বিপদের দিনে গ্যারান্টি কেনা যায় না।
আরেকটি সমস্যা ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রেই। সৌদি-সমর্থিত শিবির নিজেই একরঙা নয়। সেখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, স্থানীয় মিলিশিয়া এবং বিভিন্ন বিদেশি পৃষ্ঠপোষকের স্বার্থ পাশাপাশি চলে। সবাই হুতিবিরোধী, কিন্তু সবাই একই ইয়েমেন চায় না। ফলে মানচিত্রে যাদের একই দলে দেখা যায়, মাঠে তাদের অগ্রাধিকার আলাদা।
একজন সামনে এগোয়, আরেকজন বন্দরের মালিকানা হিসাব করে; কেউ রাজধানী নিয়ে ভাবে, কেউ দক্ষিণ নিয়ে। হুতি অন্তত একটি সুবিধা পায়—তার শত্রুর সংখ্যা বেশি, কিন্তু শত্রুদের লক্ষ্য এক নয়।
অন্যদিকে হুতি বেদুঈনদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নামই যুদ্ধ। ২০০৪ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ইয়েমেনি সরকারের সঙ্গে ছয় দফা সংঘর্ষ, ২০১৫ থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযান—দুই দশকের মার খেতে খেতে তারা শিখেছে পাহাড় কীভাবে ঢাল হয়, গুহা কীভাবে অস্ত্রাগার হয়, লঞ্চার ছুড়ে কীভাবে পালাতে হয়, ড্রোন কীভাবে কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। সিএসআইএসসহ বিভিন্ন গবেষণা দেখিয়েছে, ইয়েমেন ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহারের বড় পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। ছড়িয়ে রাখা চলমান অস্ত্রব্যবস্থা আকাশ থেকে পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইরান। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে হুতিদের অস্ত্র, অর্থ ও কৌশলগত সহায়তায় তেহরানের ভূমিকার কথা এসেছে; যদিও ইরান সরাসরি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। একসময় পাহাড়ি বিদ্রোহী সংগঠন হিসেবে দেখা হুতিরা এখন বহু গুণ বড় সামরিক শক্তি। যে যুদ্ধ তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কথা ছিল, সেই যুদ্ধই তাদের দীর্ঘ সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
সৌদির জন্য যুদ্ধের আরেকটি নির্মম দিক হলো খরচের অনুপাত। একটি সস্তা ড্রোন ঠেকাতে যে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, তার দাম কখনো আক্রমণকারী ড্রোনের দামের বহু গুণ। যুদ্ধ তাই শুধু আকাশে হয় না, হিসাবের খাতাতেও হয়। হুতি একটি লক্ষ্যবস্তু মিস করলেও সৌদিকে রাডার চালাতে হয়, বিমান ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হয়, ঘাঁটি পাহারা দিতে হয়, বন্দর ও তেল স্থাপনার নিরাপত্তা বাড়াতে হয়। অর্থাৎ প্রতিটি সম্ভাব্য হামলাও সৌদির কাছে খরচ; হুতির কাছে অনেক সময় শুধু অপেক্ষা।
এই যুদ্ধে সৌদি আর হুতির ক্ষতির অঙ্কও এক নয়। সৌদির হারানোর জিনিস অনেক—তেলক্ষেত্র, শোধনাগার, বিমানবন্দর, বিনিয়োগ, পর্যটন, নিওম, ভিশন ২০৩০, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। হুতিদের একটি ড্রোন ঠিক জায়গায় পড়লে শুধু স্থাপনার ক্ষতি হয় না, সৌদির নিরাপত্তার বিজ্ঞাপনেও ছিদ্র হয়। হুতিদের একটি লঞ্চার ধ্বংস হলে আরেকটি আসতে পারে, একটি গুহা নষ্ট হলে আরেক পাহাড় আছে। দশটি ড্রোন নষ্ট হলেও একটি যদি তেল স্থাপনায় পৌঁছে যায়, সেটিই বিশ্বের বড় খবর।
অসম যুদ্ধের নির্মম গণিত এখানেই। রাষ্ট্রকে প্রায় প্রতিদিন সফল হতে হয়; বিদ্রোহীর মাঝে মাঝে সফল হলেই চলে। রাজপ্রাসাদের সমস্যা—তার জানালা অনেক। পাহাড়ের সমস্যা কম; তার জানালা নেই, কাঁচও নেই।
সৌদির আরেক সংকট—অস্ত্রের মালিক হয়েও তারা পুরো অস্ত্রব্যবস্থার মালিক নয়। সৌদি সামরিক শিল্প কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২০২৪ সালের শেষে সামরিক ব্যয়ের স্থানীয়করণ ছিল ২৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এফ-১৫ সৌদির, কিন্তু যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল ও লজিস্টিক সহায়তার বড় অংশ বাইরে নির্ভরশীল। বিমানটি নিজের, কিন্তু চাবির গোছার কিছু অংশ এখনও অন্যের পকেটে।
সংকট বাড়তেই তাই পুরোনো বন্ধুদের দিকে ফোন গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ওয়াশিংটন সরাসরি যুদ্ধে নামেনি; সহায়তা সীমিত রেখেছে গোয়েন্দা ও কৌশলগত সহযোগিতায়। ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা ও আকাশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আঞ্চলিক মাধ্যমে খবর এসেছে, যদিও সৌদি সরকার প্রকাশ্যে এমন সহায়তার কথা নিশ্চিত করেনি।
আর আছে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি। চুক্তির সময় কথাগুলো ছিল ভারী—একজন আক্রান্ত হলে সবাই আক্রান্ত। শুনলে মনে হয়, একজনের উঠোনে ঢিল পড়লে তিন বাড়ি থেকে একসঙ্গে লাঠি বের হবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেখা গেল, সবাই হাত গুটিয়ে বসে রইলো।
তুরস্ক কঠোর ভাষায় হামলার নিন্দা করেছে, সৌদির সার্বভৌমত্বের পাশে থাকার কথাও বলেছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তুর্কি বিমান বা সেনা নেই। অর্থাৎ বন্ধুত্ব আছে, সংহতি আছে, বিবৃতি আছে—শুধু গোলাবারুদের অংশটি আপাতত প্রেস বিজ্ঞপ্তির বাইরে।
পাকিস্তানের অবস্থানও কম মজার নয়। ইসলামাবাদ বলেছে, চুক্তির আওতায় সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। পাকিস্তান চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সৌদির পাশেও আছে—শুধু সেই ‘পাশে থাকা’ এখনও যুদ্ধের মাঠ পর্যন্ত পৌঁছায়নি। কাগজে তিন দেশ একে অন্যের ঢাল; বাস্তবে সৌদি সাহায্যের জন্য তাকাচ্ছে আরও দূরের বন্ধুদের দিকে। চুক্তির ভাষা বহুপক্ষীয়, বিপদ একপক্ষীয়; বাকিরা আপাতত বিবৃতির বাঙ্কারে নিরাপদ।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব ধরে রাখা, ইরানের প্রভাব ঠেকানো এবং আঞ্চলিক কর্তৃত্ব বাড়াতেও সৌদি অর্থ ও মতবাদ ব্যবহৃত হয়েছে। তখন তেল শুধু গাড়ি চালাত না, মতবাদও চালাত।
সৌদির বন্ধুদের আসল চেহারাটি আরও গভীরে। যে হুতিদের এত বছর বোমা মেরে শেষ করার কথা ছিল, তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেই এখন আমেরিকান কর্মকর্তারা ওমানে দরজা বন্ধ করে কথা বলছেন। যুদ্ধের এমনই স্বভাব—যাকে সকালে শত্রু বলা হয়, সন্ধ্যায় তার সঙ্গেই দরকষাকষির টেবিলে বসতে হয়।
সব মিলিয়ে সৌদির বিপদ শুধু হুতি নয়। বিপদ তার বহুদিনের একটি বিশ্বাসে—টাকা থাকলে শক্তি কেনা যায়, অস্ত্র থাকলে নিরাপত্তা কেনা যায়, আর বন্ধু থাকলে যুদ্ধের দিনে সবাই এসে পাশে দাঁড়ায়। বাস্তবতা হলো, টাকা থাকলে অনেক কিছু কেনা যায়; শুধু বিপদের দিনে গ্যারান্টি কেনা যায় না।
হুতিদের সবচেয়ে বড় অর্জন তাই হয়তো কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত নয়। তারা সৌদির বহু বছরের নিরাপত্তা-দর্শনকেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। রিয়াদ শক্তির হিসাব করেছে ডলারে, অস্ত্রের সংখ্যায়, মিত্রের তালিকায়। হুতি হিসাব করেছে পাহাড়ে, সময়ে, সহ্যক্ষমতায়।
ইতিহাসের রসিকতা এমনই। একসময় সৌদি সীমান্তের বাইরে মতবাদ পাঠিয়েছে, অস্ত্র কিনেছে, প্রভাব কিনেছে, বন্ধু জড়ো করেছে। আজ পাহাড় থেকে একটি ছোট ড্রোন উড়ে এসে যেন শুধু একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—প্রাসাদের দেয়াল তো অনেক উচু হলো, জাহাপনা। কিন্তু সস্তা ড্রোন রুখবেন কী দিয়ে?
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট





