স্যাটেলাইট ছবিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি

স্যাটেলাইট ছবিতে স্পষ্ট ধ্বংসের চিহ্ন।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর ১০০ দিন পেরিয়ে গেলেও পুরো অঞ্চলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা এখনো কঠিন। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট অপারেটর প্ল্যানেট ল্যাবসসহ কয়েকটি স্যাটেলাইট ছবি সংশ্লিষ্ট সংস্থা ওয়াশিংটনের অনুরোধে সংঘাত-সম্পর্কিত ছবি প্রকাশে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
তবে বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার আগে এয়ারবাস, প্ল্যানেট ল্যাবস, সেন্টিনেল ও ভ্যান্টরের ক্যামেরায় ধরা পড়ে ধ্বংসযজ্ঞের বিস্তৃত চিত্র।
আল জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিট ইরান, লেবানন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি স্থানের স্যাটেলাইট চিত্র একত্র করে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি দেখার চেষ্টা করেছে।
ইরানের বিভিন্ন স্থাপনা
ইসফাহান প্রদেশে অবস্থিত দেশটির সবচেয়ে বড় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নাতাঞ্জ কমপ্লেক্স ২০২৫ সালের জুনে দুইবার হামলার শিকার হয়। প্রথমে ইসরায়েল এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর অংশ হিসেবে জিবিইউ-৫৭ বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ব্যবহার করে নাতাঞ্জে আঘাত হানে। সে সময় হামলা করা হয়েছিল ফোরদো ও ইসফাহানেও।
মার্চের শুরুর দিকে তোলা হামলার আগে ও পরের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ভবন, র্যাম্প এবং ভূগর্ভস্থ সমৃদ্ধকরণ হলের দিকে যাওয়া কর্মী ও যানবাহনের প্রবেশপথে সরাসরি কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।
সিরি দ্বীপ
ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিরি দ্বীপ। এটি দেশটির কয়েকটি বড় তেলক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল তোলা সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইট চিত্রে দ্বীপটির তেল স্থাপনায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড দেখা যায়। ওপেন সোর্স ইউনিটের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক মিলিয়ন ব্যারেল ধারণক্ষমতার সবচেয়ে বড় সংরক্ষণ ট্যাংকে সরাসরি আঘাত লেগেছে। এর আগে খার্গ দ্বীপের প্রধান তেল টার্মিনালেও একই ধরনের হামলার চিহ্ন দেখা গিয়েছিল।
বন্দর আব্বাস
হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত ইরানের বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ এপ্রিলের মধ্যে ধারণ করা প্ল্যানেট ল্যাবস ও এয়ারবাসের স্যাটেলাইট চিত্রে কমপ্লেক্সটির ১১টি স্থানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ গুদামঘর ও একটি নোঙর করা জাহাজে গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে।
ফাতাহ এয়ারবেজ
তেহরানের পশ্চিমে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে কারাজের কাছে অবস্থিত ফাতহ বিমানঘাঁটি আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্সের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাটাক হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রন ও ড্রোন ইউনিট রয়েছে।
২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল তোলা হাই রেজল্যুশনের এয়ারবাস স্যাটেলাইট চিত্রে ঘাঁটির বিস্তৃত ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যায়। বিশ্লেষণে উত্তরাঞ্চলের হ্যাঙ্গার ও প্রযুক্তিগত স্থাপনার ছাদ ধসে পড়া, ব্যাপক কাঠামোগত ক্ষতি, রানওয়েতে ধ্বংসাবশেষ ও আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
বন্দর আব্বাস নৌঘাঁটি
হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত বন্দর আব্বাস নৌঘাঁটি ইরানের নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি।
২০২৬ সালের ২ মার্চ ধারণ করা প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্রে বন্দরের বিভিন্ন স্থানে হামলার চিহ্ন দেখা যায়। বিশ্লেষণে ‘আইআরআইএস মাকরান’ জাহাজে সরাসরি আঘাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। জাহাজটির গায়ে আগুন এবং ডেক থেকে ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। পাশাপাশি ঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও বড় অগ্নিকাণ্ডের প্রমাণ মিলেছে।
লেবাননের বিভিন্ন স্থাপনা
দক্ষিণ-পশ্চিম লেবাননের নাকুরা অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সীমান্ত এলাকা এবং জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী শান্তিরক্ষা বাহিনী ইউনিফিলের সদর দপ্তর।
২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে ধারণ করা প্ল্যানেট ল্যাবস ও এয়ারবাসের স্যাটেলাইট চিত্রে এলাকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যায়। বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেখানকার শতাধিক ভবন ধ্বংস হয়েছে।
বিনত জবেইল
বিনত জবেইলকে দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত অঞ্চলের প্রতীকী ও ঐতিহাসিক রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে ইসরায়েলি স্থল অভিযান ও বিমান হামলার ফলে শহরজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশ্লেষণে প্রায় ৭২৫টি ভবন ও স্থাপনায় গুরুতর ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাশাফ
ইসরায়েল সীমান্তসংলগ্ন বিনত জবেইল জেলার পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত রাশাফ শহরটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও কৃষিভিত্তিক কেন্দ্র।
চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে ধারণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে পুরো এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যায়। বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে, পুরো আবাসিক এলাকা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
কোজাহ ও বেইত লিফ
পাশাপাশি অবস্থিত দক্ষিণ লেবাননের দুই শহর কোজাহ ও বেইত লিফ ইসরায়েল সীমান্ত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে ধারণ করা হাই রেজল্যুশনের এয়ারবাস স্যাটেলাইট চিত্রে দুটি শহরেই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যায়। বিশ্লেষণে সেন্ট জোসেফ চার্চ এবং ইউনিফিলের একটি শান্তিরক্ষা অবস্থানসহ ঐতিহাসিক বেসামরিক ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা
কাতারের রাজধানী দোহার দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল উদেইদ বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল ধারণ করা প্ল্যানেট ল্যাবস ও এয়ারবাসের স্যাটেলাইট চিত্রে ঘাঁটির তিনটি স্থানে হামলার ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি লজিস্টিকস অপারেশন ভবন ধ্বংস, একটি ছোট বিমান আশ্রয়কেন্দ্রে ক্ষতি এবং ক্যাম্প অ্যান্ডির আবাসন ও সহায়তা স্থাপনার একটি ভবনে আংশিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কুয়েতের আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটি
কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পরিবহন কেন্দ্র।
২০২৬ সালের ১ মার্চ তোলা উচ্চ রেজল্যুশনের এয়ারবাস স্যাটেলাইট চিত্রে ঘাঁটির নয়টি স্থানে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা যায়। দেখা গেছে, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের তাঁবু এলাকা ও লজিস্টিকস স্থাপনায় ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষয়ক্ষতি কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে হয়েছে।
আল ধাফরা বিমানঘাঁটি
আবুধাবির দক্ষিণে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল ধাফরা বিমানঘাঁটি উপসাগরীয় অঞ্চলে পশ্চিমা ও মিত্রবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮০তম এয়ার এক্সপেডিশনারি উইং মোতায়েন রয়েছে।
২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল তোলা সেন্টিনেল ও এয়ারবাসের স্যাটেলাইট চিত্রে ঘাঁটিতে নতুন ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া যায়। বিশ্লেষণে ঘাঁটির কয়েকটি প্রধান বিমান হ্যাঙ্গারে সরাসরি আঘাতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি
রিয়াদের দক্ষিণে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি রয়্যাল সৌদি এয়ার ফোর্স এবং মার্কিন বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি।
২০২৬ সালের ২৯ মার্চ তোলা সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর ঘাঁটির অন্তত তিনটি স্থানে ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশ্লেষণে রানওয়েতে পোড়া দাগ, সংলগ্ন ভবনে কাঠামোগত ক্ষতি এবং বিমান পার্কিং এলাকায় যাওয়ার প্রধান রানওয়েতে সরাসরি আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত হয়েছে।
মিনা সালমান নৌঘাঁটি
বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত মিনা সালমান নৌঘাঁটিতে থাকা মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অভিযান পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র।
২০২৬ সালের ১ মার্চ ধারণ করা প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানি হামলার পর নৌঘাঁটিতে ব্যাপক কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়। বিশ্লেষণে একাধিক রাডার ডোমে সরাসরি আঘাত এবং ঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ভবনগুলোতে ব্যাপক ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।


















