সৌদিতে বারবার সতর্কতা, হুতিদের সঙ্গে বাড়ছে পাল্টাপাল্টি হামলা

সৌদি আরবের জাজান অঞ্চলের আল-তুওয়ালে হুতিদের ছোড়া প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি মসজিদ। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর মিসাইল ও ড্রোন হামলার হুমকির জেরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও আল-খারজে রাতভর চার দফায় বিপদসংকেত জারি করা হয়েছে। পরে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই এলাকাতেই বিপদ কেটে গেছে। বাসিন্দাদের সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে এবং বাইরে জড়ো হওয়া ও ছবি তোলা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
সৌদির জাতীয় আগাম সতর্কতা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব সতর্কতা জারি করা হয়। সতর্কতার সময় বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকতে, জানালা ও খোলা জায়গা থেকে দূরে থাকতে এবং বারান্দা বা ছাদে না যেতে বলা হয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাইরে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত কাছের ভবনে আশ্রয় নিতে হবে। তা সম্ভব না হলে শক্ত কোনো স্থাপনার আড়ালে নিরাপদ জায়গায় থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে ৯১১ নম্বরে ফোন করতে বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সৌদি আরবে এ ধরনের সতর্কতা বারবার জারি হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে রিয়াদ, আল-খারজ, মক্কা, জেদ্দা, তাইফ, খামিস মুশাইত, আবহা, জাজান, আল-উলা, ইয়ানবু ও শারুরাহসহ অন্তত ১১টি শহর ও এলাকায় সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
৯ সেপ্টেম্বরের পর অন্তত ২৪টি এলাকাভিত্তিক সতর্কতা জারি হয়েছে। আবহা ও খামিস মুশাইতকে অন্তত চারবার সতর্কতার আওতায় আনা হয়েছে। তাইফে সতর্কতা জারি হয়েছে অন্তত তিনবার। জেদ্দা, আল-উলা, ইয়ানবু, রিয়াদ ও আল-খারজে অন্তত দুবার করে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
এ সতর্কতার পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা সংঘাত। হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য হিসেবে তারা শহর, সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামোর কথা বলেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার জবাবে তাদের হামলা অব্যাহত থাকবে। হুতিরা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মক্কার মতো পবিত্র স্থানে হামলা চালানোর সৌদি অভিযোগও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে হুতিদের বড় ধরনের হামলায় সৌদি আরবে ৭৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পরে খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফে হামলায় আরও ১৩ জন আহত হন। তাইফে একটি ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে এক ইয়েমেনি বাসিন্দা নিহত হন।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের হামলার জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা ‘দায়িত্বশীল ও কঠোরভাবে’ ব্যবস্থা নেবে।
ইয়েমেনেও তীব্র হচ্ছে লড়াই
সৌদি আরবের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও লড়াই তীব্র হয়েছে। হুতিরা দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সৌদি আরব ২৬টি হামলা চালিয়েছে। গত এক সপ্তাহে সৌদি হামলার সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা। এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, তাইজ প্রদেশের আল-ওয়াজিয়াহ এলাকায় ২৪ ঘণ্টার সংঘর্ষে ৩০ হুতি যোদ্ধা নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ইয়েমেনি বাহিনী হুতিদের অবস্থান ও রসদ সরবরাহের পথেও হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে।
তাইজ ও এর আশপাশের কয়েকটি এলাকায় চলতি সপ্তাহে লড়াই বেড়েছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছেও দুপক্ষের সংঘর্ষ চলছে। পশ্চিম ইয়েমেনে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এ লড়াইকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এরই মধ্যে ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে বড় মানবিক সংকট তৈরি করছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার হিসাবে, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে দেশটির ভেতরে ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আরও প্রায় ৩ হাজার মানুষ সাগর পাড়ি দিয়ে জিবুতিতে পালিয়েছেন।
কেন বাড়ছে উত্তেজনা
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোয় সেই পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। হুতিরা পশ্চিম ইয়েমেনে দ্রুত অগ্রসর হয়ে লোহিত সাগরের উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা দখলে নিয়েছে। এর মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছের এলাকাও রয়েছে।
বাব আল-মান্দেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। লোহিত সাগর দিয়ে এ পথ হয়ে জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে। ফলে ইয়েমেনে লড়াই যত বাড়ছে, ততই এই নৌপথ ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতও তাই শুধু দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। একদিকে সৌদি শহর ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বাড়ছে। অন্যদিকে ইয়েমেনে সৌদি ও মিত্র বাহিনীর বিমান হামলা চলছে।
রিয়াদ ও আল-খারজে বারবার সতর্কতা জারি এবং ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা দেখাচ্ছে, সংঘাতটি আবারও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। সৌদি আরবে নিরাপত্তা সতর্কতা বাড়ছে, আর ইয়েমেনে বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা।
সূত্র : আল জাজিরা






