স্বাধীনতা, মর্যাদা ও একটি নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ
গণআন্দোলনে গাজার মানুষ

২৬ জুনের আন্দোলনে গাজায় স্থানীয় বিক্ষোভকারীদের মিছিল। ছবি : সংগৃহীত
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষের জীবন এখন যেন এক অন্তহীন অপেক্ষার নাম। অপেক্ষা একটি রুটির জন্য, এক ফোঁটা পরিষ্কার পানীয়জলের জন্য, একটি ওষুধের জন্য, কিংবা এমন একটি সকালের জন্য- যেদিন কোনো বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভাঙবে না। আর গত ২৬ জুন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা ভূখণ্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল একটিই স্লোগান- মানুষ বাঁচতে চায়। মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায়। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার চায়।
‘২৬ জুন আন্দোলন’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগকে অনেকেই হামাস-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আন্দোলনের ঘোষিত দাবি ও এর সমর্থকদের বক্তব্য অন্য কথা বলছে। গাজার ভাঙাচোরা তাঁবু, অস্থায়ী আশ্রয়শিবির আর ধ্বংসস্তূপে ঘেরা জনপদে আজ মানুষের প্রধান পরিচয় কোনও রাজনৈতিক দলের সমর্থক নয়; তারা ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত। যাদের ভবিষ্যতের কোন নিশ্চয়তা নেই। তাদের সন্তানদের টানা তৃতীয় বছরের মতো নিয়মিত শিক্ষা নেই। বিদ্যুৎ নেই, নিরাপদ পানীয় জল নেই, পর্যাপ্ত চিকিৎসা নেই। প্রতিদিন খাবারের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক টুকরো রুটি বা সামান্য খাবারের জন্য।
এই নির্মম বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ক্ষোভ। মিশরে থাকা ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও কর্মী আবদুল হামিদ আবদুল আতি কয়েক মাস আগে যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তার মূল কথা ছিল - গাজার মানুষকে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিজেদেরই তুলে ধরতে হবে। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ। কেউ ফাতাহ-ঘনিষ্ঠ, কেউ স্বাধীন কর্মী, কেউ আবার দীর্ঘদিন ধরেই হামাসের সমালোচক। তবে আন্দোলনের বার্তায় একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল। তারা যেমন হামাসের জবাবদিহি চাইছে, তেমনই ইজ়রায়েলি দখলদারি, অবরোধ ও সামরিক অভিযানেরও বিরোধিতা করছে। আন্দোলনের ঘোষণাপত্রে দখলদার শক্তিকেই প্রধান শত্রু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক শাসন, জনগণের মতামতের প্রতি সম্মান এবং গাজার মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবি জানানো হয়েছে।
কিন্তু গাজার ট্র্যাজেডি এখানেই। সেখানে মানুষের কান্নাও রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে যায়। কেউ যদি হামাসের সমালোচনা করেন, তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলা হয়। আবার কেউ যদি ইজ়রায়েলি হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, তাকে হামাস-সমর্থক বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত দাবি প্রায়ই হারিয়ে যায় রাজনৈতিক প্রচারের আড়ালে।
এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। ২০১৮-১৯ সালের ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’-এর সময়ও হাজার হাজার নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি সীমান্তের কাছে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের অনেককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। সেই সময়ও বিক্ষোভকারীদের একাংশ হামাসের নীতি, গাজার অভ্যন্তরীণ সংকট ও রাজনৈতিক বিভাজনের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
একই ঘটনা ঘটেছিল ২০২৫ সালের মার্চ মাসেও। যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে হামলা শুরু হওয়ার পর উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। তাদের স্লোগান ছিল- ‘আমরা বাঁচতে চাই, আমরা মরতে চাই না, যুদ্ধ বন্ধ করো।’ তারা যেমন ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করেছিলেন, তেমনই হামাসের শাসন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু সেই আন্দোলনও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রচারযুদ্ধের বলি হয়।
২৬ জুনের আন্দোলন ঘিরেও একই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একদিকে ইজ়রায়েলপন্থী মহলের একাংশ আন্দোলনটিকে কেবল হামাস-বিরোধী বিদ্রোহ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। অন্যদিকে হামাস-সমর্থক গোষ্ঠীর একটি অংশ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সন্দেহ ও অপপ্রচারের পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আড়ালে চলে যাচ্ছে-গাজার মানুষ আসলে কী চাইছে?
তারা চায় অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার সুযোগ। তারা চায় শরণার্থী শিবিরে ছড়িয়ে পড়া রোগের হাত থেকে বাঁচতে। তারা চায় গাজা থেকে বেরিয়ে চিকিৎসা করানোর স্বাধীনতা। তারা চায় পুনর্গঠন, ঘরে ফেরা এবং স্বাভাবিক জীবন। সবচেয়ে বড় কথা, তারা চায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্যেরা নয়, তারাই কথা বলুক। কিন্তু আন্দোলনের সামনে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা রয়েছে।
সাধারণত গণআন্দোলন সফল হয় তখনই যখন তা রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গাজায় সেই রাষ্ট্রযন্ত্র, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর বড় অংশই ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। যুদ্ধ মানুষের জীবনকে এমনভাবে ভেঙে দিয়েছে যে প্রতিবাদও অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে। তবু এই আন্দোলনের তাৎপর্য অন্য জায়গায়। এটি মূলত গাজার মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার আর্তি। যারা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও সন্তানদের জন্য একটি আগামী দিনের স্বপ্ন দেখতে চায়।
লেখক : কলকাতা প্রতিনিধি, আগামীর সময়।




