আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির গলার কাঁটা ইসরায়েল

লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে আঘাত হানা হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী গত বুধবার লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় নিহত হয়েছেন ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়া পর এটিই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ইসরায়েল দাবি করেছে, ওই হামলায় তারা হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের এক সহযোগীকেও হত্যা করেছে।
এই হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষণা করা হয় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি। এই ঘোষণা অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা কমার আশা তৈরি করেছিল।
গত বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, তার সরকার যুদ্ধবিরতির এই চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। এই চুক্তির আওতায় সব অঞ্চলে হামলা বন্ধের কথা রয়েছে। চুক্তিতে লেবাননের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েল দাবি করছে, তারা ইরান-সমর্থিত সংগঠন হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে।
তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ভিন্নমত পোষণ করেছে এ ব্যাপারে। তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার হামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা এই যুদ্ধবিরতির আওতার বাইরে।
বৈরুতের তাল্লেত আল-খাইয়াত এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলাস্থলে উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হয়েছেন।
সাম্প্রতিক এই সহিংসতা যুদ্ধবিরতির আওতা নিয়ে তৈরি করেছে বড় ধরনের মতপার্থক্য ও বিভ্রান্তি। স্থায়ী সমাধানের আগে চুক্তিটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। আগামীকাল শনিবার ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পর লেবাননে ইসরায়েলের হামলা
বুধবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল লেবাননে ১০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। মার্চের ২ তারিখের পর এটিই সবচেয়ে বড় আকারের হামলা।
লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, বৈরুত, বেকা উপত্যকা এবং দক্ষিণ লেবাননের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে চালানো হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত এবং ১ হাজার ১৬৫ জন আহত হয়েছেন।
লেবাননের চিকিৎসক সমিতির প্রধান এলিয়াস শ্লেলা জরুরিভিত্তিতে সব চিকিৎসকদের হাসপাতালে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বৈরুতের একটি বড় হাসপাতাল সব ধরনের রক্তদানের আবেদন জানিয়েছে।
জাতিসংঘ এই হতাহতের সংখ্যা ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ক এই ধ্বংসযজ্ঞকে ধ্বংসযজ্ঞকে ‘হৃদয়বিদারক’বলে অভিহিত করেন।
ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা হিজবুল্লাহর সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে লেবাননের কর্মকর্তারা ও ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে, পুরো পাড়া-মহল্লা ধ্বংস হয়ে গেছে। হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে পড়ছে এবং জরুরি সেবা সংকটের মুখে পড়েছে।
লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নবিহ বেরি এই হামলাকে ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধাপরাধ’ বলে আভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, এই হামলা এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একটি চুক্তি যা ইসরায়েল ও তার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি মানতে ব্যর্থ হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে মতবিরোধ
বর্তমানে মূল কূটনৈতিক বিরোধটি হলো- লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত কি না। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল এবং পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফ এক পোস্টে বলেছেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা অবিলম্বে সর্বত্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যার মধ্যে লেবাননও রয়েছে।
ইরানও বলেছে, এই যুদ্ধবিরতি লেবানন পর্যন্ত প্রসারিত। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যুদ্ধবিরতি নাকি ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। দুটোই হতে পারে না। বিশ্ব লেবাননের হত্যাযজ্ঞ দেখছে। বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, ইরান ভেবেছিল লেবাননও এই চুক্তির অংশ। কিন্তু তা নয়।
লেবাননের বাবদা থেকে দেখা যাচ্ছে, বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলি হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের ওপর এই যুদ্ধবিরতির কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
কেন লেবানন ইস্যুতে অনড় ইরান?
লেবানন ইস্যুতে ইরানের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হিজবুল্লাহ ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র এবং অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইরানকে তার আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করতে হবে। কিন্তু লেবাননকে যুদ্ধবিরতির বাইরে রাখলে ইরানের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা কৌশল দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য হতে পারে, যা পুরো যুদ্ধবিরতিকে ভেঙে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইসরায়েলের এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।
কাতার হামলাকে নৃশংস বলে আখ্যা দিয়েছে। মিশর বলেছে, এটি উত্তেজনা বাড়ানোর উদ্দেশে পরিকল্পিত পদক্ষেপ। তুরস্ক জানিয়েছে, এতে লেবাননের মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক আইন ও মানবজীবনের প্রতি অবজ্ঞা অসহনীয়।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেছেন, লেবাননকে যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত করতেই হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, লেবাননে চলমান সামরিক কার্যক্রম এই যুদ্ধবিরতির জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস বলেছেন, ইসরায়েলের পদক্ষেপ যুদ্ধবিরতিকে চরম চাপে ফেলেছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইওহান ওয়াডেফুলও ইসরায়েলকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে লেবাননে ১২ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
সূত্র: আল-জাজিরা
