ইরান কি বাহিদির কথায় চলছে?

আহমাদ বাহিদি
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অচলাবস্থায় আটকে থাকা আলোচনার মধ্যেই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে উত্থান ঘটেছে কট্টরপন্থি সামরিক নেতা আহমাদ বাহিদির। দেশ-বিদেশে আলোচিত একাধিক হামলার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত এই বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার এখন তেহরানের যুদ্ধনীতি ও কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তার নাম।
যুদ্ধ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ বাহিদি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধসমাপ্তি আলোচনায় ইরানের কঠোর অবস্থান নির্ধারণে পালন করছেন বড় ভূমিকা। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি এমন একটি ছোট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সদস্য, যারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারির ইসরায়েলি হামলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর আত্মগোপনে রয়েছেন মোজতবা খামেনি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। দেশটির ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উচ্চপর্যায়ে ক্ষমতার লড়াই চলছে এবং প্রভাব দ্রুত বাড়তে বা কমতে পারে সেখানে।
বাহিদিকেও ৮ ফেব্রুয়ারির পর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি, যা যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগের ঘটনা। আজ বৃহস্পতিবার ইরানি গণমাধ্যমে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তেহরানে বাহিদির বৈঠক নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবর প্রকাশিত হয়। ওই মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাসংক্রান্ত বার্তা বহন করেছিলেন এবং সাক্ষাৎ করেন ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও।
দীর্ঘদিন ধরে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বাহিদি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনায় একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলার ঘটনায়ও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২০২২ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে রক্তক্ষয়ী অভিযানে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন তিনি।
সংঘাতমুখী মানসিকতা
চলতি বছর যুদ্ধে নিহত পূর্বসূরির স্থলাভিষিক্ত হয়ে বিপ্লবী গার্ডের প্রধান হন বাহিদি। বর্তমানে তিনি ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার হাতে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার এবং পারস্য উপসাগরের জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ছোট নৌযানের বহর।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার বলেছে, ‘বাহিদি এবং তার ঘনিষ্ঠদের একটি অংশ সম্ভবত শুধু যুদ্ধের সামরিক প্রতিক্রিয়ার ওপরই নয়, বরং ইরানের আলোচনানীতির ওপরও প্রতিষ্ঠা করেছে নিয়ন্ত্রণ।’
তেহরানের ধারণা, তারা চলমান অচলাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখতে পারবে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগরীয় মিত্রদের বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করতে চাইবেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাহিদির সংঘাতমুখী মানসিকতার প্রতিফলন। নিউইয়র্কভিত্তিক থিংক ট্যাংক দ্য সৌফান গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ফেলো কেনেথ কাটজম্যান বলেছেন, ‘তিনি অন্তহীন বিপ্লব ও অন্তহীন প্রতিরোধের চিন্তাধারা থেকে উঠে এসেছেন।’ তিন দশকের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসকে ইরানবিষয়ক পরামর্শ দেওয়া কাটজম্যান বলছেন, ‘বাহিদি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে।’
জানুয়ারিতে বাহিদি দাবি করেছিলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শত্রুপক্ষের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ হয়ে উঠেছে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’।
এপ্রিল মাসে পাকিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের প্রতিনিধি দলে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তবে বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়।
দেশে ফিরে গালিবফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার প্রবণতার অভিযোগ ওঠে। গালিবফকে প্রকাশ্যে বলতে হয় যে আলোচনা হয়েছে সর্বোচ্চ নেতার সমর্থন পেয়েই।
এর পর থেকেই ইরানের সঙ্গে আলোচনাকারীদের প্রধান যোগাযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছেন বাহিদি বলে জানিয়েছেন মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা।
বিশ্লেষক কামরান বুখারি লিখেছেন, বাহিদির মতো ব্যক্তিরা ‘শুধু যুদ্ধ পরিচালনা করছেন না, বরং উত্তরাধিকার প্রশ্নকে নতুনভাবে সাজাচ্ছেন, দুর্বল সর্বোচ্চ নেতাকে ঘিরে কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত করছেন এবং সংকটকে ব্যবহার করে কার্যত নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছেন রাষ্ট্রকে।’
কে এই বাহিদি
১৯৫৮ সালে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শিরাজে আহমাদ শাহচেরাগি নামে জন্ম নেওয়া বাহিদি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর বিপ্লবী গার্ডে যোগ দেন এবং সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের বিরুদ্ধে আট বছরব্যাপী যুদ্ধে অংশ নেন।
পরে তিনি বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা শাখায় যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের বাইরের অভিযান তদারকির দায়িত্ব পান। সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আস্থাও অর্জন করেন।
মার্কিন তদন্তকারীদের ধারণা, বাহিদির সময়েই ১৯৯৬ সালে সৌদি আরবে খোবার টাওয়ার্সে বোমা হামলার পরিকল্পনা করা হয়, যাতে ১৯ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হন। এই হামলার সঙ্গেও জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান।
সাম্প্রতিক সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে জড়িত পুলিশ ইউনিটগুলোর তদারকি করেন। হিজাব সঠিকভাবে না পরার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয়েছিল মাহসা আমিনির।
পরে একটি ইরানি পত্রিকা গোপন নথি প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় বাহিদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে হিজাব না পরা নারীদের নজরদারি ও ছবি তোলার নির্দেশ দিয়েছিল। যদিও এর আগে এমন কিছু ঘটছে না বলে দাবি করেছিলেন বাহিদি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাহিদির প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো আরও কঠিন করে তুলছে। একই সঙ্গে ইরানের নেতৃত্বের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশাও জটিল করছে পরিস্থিতিকে।
ট্রাম্প আলোচনার জন্য ইরানে একজন নির্দিষ্ট প্রতিনিধির সঙ্গে কাজ করতে চান। তবে মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি বলেছেন, ‘পুরো ব্যবস্থাই বদলে গেছে।’
তিনি বলেছেন, ‘এটি একজনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা নয়। বাহিদি অনেকের মধ্যে একজন। কিছু মানুষকে আমরা চিনি, আবার কিছু মানুষকে চিনি না।’






