হরমুজ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কা

১৫ জুলাই ওমান উপসাগর থেকে হরমুজ প্রনালিতে বেশ কয়েকটি জাহাজ দেখা যাচ্ছে। ছবি : রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে শুরু হওয়া উত্তেজনা দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধ এখন শুধু একটি সামরিক বা কূটনৈতিক সংকট নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সংঘাতের সূচনা হতে পারে।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের অবসান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করা। তবে চুক্তির কয়েকটি ধারা অস্পষ্ট হওয়ায় শুরু থেকেই মতবিরোধ তৈরি হয়।
বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি পরিবহন হয়। চুক্তির একটি ধারায় ইরানকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ইরান এর ব্যাখ্যা দিয়েছে ভিন্নভাবে।
তেহরানের দাবি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ হলো প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং কোন জাহাজ কোন পথে চলবে তা নির্ধারণ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরানের দায়িত্ব হলো কোনো শর্ত ছাড়াই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা। এই মতপার্থক্য থেকেই সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ওমান উপকূলঘেঁষা একটি বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করতে জাহাজগুলোকে নির্দেশ দিলে ইরান আপত্তি জানায় এবং কয়েকটি জাহাজের দিকে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
এমন বাস্তবতায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টাল কমান্ড ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালানো শুরু করে এবং ইরানি বন্দরে জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করে।
সর্বশেষ বুধবার রাতভর ইরানের দক্ষিণ উপকূলসহ বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া তিন শতাধিক হয়েছেন আহত।
জবাবে, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী এবং দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সহজে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। তেহরান এটিকে শুধু একটি কৌশলগত সম্পদ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখছে।
ইরানের বিশ্বাস, এই নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতে বিদেশি আগ্রাসন ঠেকাতে পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই কার্যকর প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক দিক থেকেও হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এরই মধ্যে জানিয়েছে, তারা প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে সেবা ফি আদায় করতে চায়, যা দেশটির জন্য বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজের ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে রাজি নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রণালি ব্যবহারকারী পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ চার্জ আরোপ করবে এবং নিজেদের হরমুজ প্রণালির অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
যদিও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মিত্রদের চাপে তিনি দ্রুত এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন এবং জানান, উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো আমেরিকায় বিনিয়োগের শর্তে তিনি অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অবশ্য ট্রাম্পের মন্তব্যের সুযোগ নিয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদম ঠিক বলেছেন। যারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করে, তাদের এই সেবার জন্য মূল্য পাওয়া উচিত।
তিনি আরও যোগ করেন, ‘২০ শতাংশ অবশ্যই অনেক বেশি। আমরা ন্যায্য টোল নিব।’
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের যাতায়াত ব্যাপক কমেছে এবং তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই এক ধরনের কৌশলগত অচলাবস্থায় রয়েছে। ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত প্রভাব হারাতে চায় না, আবার যুক্তরাষ্ট্রও এমন একটি নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না যেখানে তেহরান একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটনের সামনে বিকল্প খুব সীমিত। ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে ইরানও ছোট নৌযান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও মাইন ব্যবহার করে সহজেই জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
এদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও দুই দেশের অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী। ইরান শান্তিপূর্ণ উদ্দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার দাবি করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র জিরো-এনরিচমেন্ট নীতিতে অনড় রয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব বিরোধ দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা কম। ফলে হরমুজকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আগামী দিনগুলোয় আরও বহুবার নতুন করে উসকে উঠতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ফেলো এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রবীণ বিশ্লেষক ফ্রান্সিস গ্রেগরি গাউসের মতে, সংঘাত থামানোর জন্য কূটনীতিই একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান, কারণ হরমুজে নিরঙ্কুশ ও একতরফা নিয়ন্ত্রণ অর্জনের মতো সুবিধাজনক অবস্থানে নেই কোনো পক্ষ।
মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে...




