তেল রপ্তানিতে রেকর্ড, ডিজেল বন্ধে রাশিয়ার আয়ে ধাক্কা
- দেড় মাসে সর্বোচ্চ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি, দামও তিন মাসের চূড়ায়
- শোধনাগারে ইউক্রেনীয় হামলা ও ডিজেল বিক্রির নিষেধাজ্ঞায় চাপ

ছবি: রয়টার্স
'তেলের ট্যাঙ্কার যত ভরে, রাষ্ট্রের কোষাগারও তত ভরে', রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই পুরোনো সমীকরণটি এখন আর পুরোপুরি কাজ করছে না। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বেড়েছে, দামও উঠেছে। তবে একই সময়ে দেশের ভেতরে জ্বালানি ঘাটতি সামলাতে ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ক্রেমলিন। ফলে এক হাতে যে বাড়তি অর্থ আসছে, অন্য হাতে তার একটি অংশ যাচ্ছে হারিয়ে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার সপ্তাহে রাশিয়ার সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি উঠেছে দৈনিক ৩৭ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে। আগস্টের শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ। একই সময়ে রাশিয়ার প্রধান উরালস ও ইএসপিও তেলের চার সপ্তাহের গড় দামও তিন মাসের বেশি সময়ের মধ্যে পৌঁছেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
ব্লুমবার্গের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলার পর মেরামতজনিত বিঘ্ন সহায়তা করেছে রুশ তেলের দাম বৃদ্ধিতে। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৮ দিনে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির মোট মূল্য সপ্তাহে গড়ে ২৩৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। আগের চার সপ্তাহের তুলনায় তা ২৯ কোটি ডলার বেশি এবং ২৪ মে শেষ হওয়া সময়ের পর সর্বোচ্চ। এক সপ্তাহের হিসাবে রপ্তানিমূল্য ছিল ২৭৫ কোটি ডলার, যা ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ।
তবে এই উল্লম্ফনের আড়ালে রয়েছে বড় দুর্বলতা। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় একাধিক রুশ শোধনাগারের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দেশে পরিশোধন করা যাচ্ছে না এমন অপরিশোধিত তেল পাঠাতে হচ্ছে বিদেশে। একই সঙ্গে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেওয়ায় সরকার অধিকাংশ ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করেছে। কিয়েভের হামলা তীব্র হওয়ার আগে রাশিয়া দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল ডিজেল বিদেশে পাঠাত। এই নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হতে পারে অক্টোবর পর্যন্ত।
রাশিয়া ২০২৬ সালের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির পূর্বাভাস দৈনিক প্রায় দেড় লাখ ব্যারেল বাড়ালেও পরিশোধিত পণ্য রপ্তানির পূর্বাভাস কমিয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ অপরিশোধিত তেলের বাড়তি চালান থেকে পাওয়া সুবিধার একটি অংশ পরিশোধিত জ্বালানি বিক্রি কমে যাওয়ায় মুছে যাচ্ছে।
২৭ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে ৩৭টি ট্যাঙ্কার বোঝাই করেছে মোট ২ কোটি ৭৯ লাখ ব্যারেল রুশ তেল। আগের সপ্তাহে ৩২টি জাহাজে ছিল ২ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল। নভোরোসিস্ক বন্দরে লোডিং বাড়লেও কিছু ট্যাঙ্কার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় অপেক্ষা করছে বলে উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে। একই সপ্তাহে সেখান থেকে কাজাখস্তানের কেবকো গ্রেডের একটি চালান গেছে। মস্কো কাজাখ তেলের চালান কৃষ্ণসাগরীয় এই বন্দর দিয়ে ঘুরিয়ে বাল্টিকের উস্ত-লুগায় নিজস্ব তেলের জন্য তৈরি করেছে বাড়তি জায়গা।
চীন ও ভারত এখনো রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার সপ্তাহে এশীয় ক্রেতাদের উদ্দেশে পর্যবেক্ষিত সরবরাহ দৈনিক ৩৬ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে উঠেছে, আগের সময়ে ছিল ৩৪ লাখ। বিপরীতে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ নেমেছে দৈনিক প্রায় এক লাখ ব্যারেলে, যা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বনিম্ন। তুরস্কে রপ্তানি কমে দৈনিক প্রায় ৫০ হাজার ব্যারেল, মিশরে স্থির রয়েছে একই পরিমাণে।
সিরিয়ায় আগস্ট থেকে রুশ তেলের প্রবাহ নেমেছে শূন্যে । যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আলোচনায় দামেস্ক রুশ তেল আমদানি 'ব্যাপকভাবে' কমাতে রাজি হওয়ার পর এসেছে এই পরিবর্তন।
রাশিয়ার তেল ব্যবসার বর্তমান ছবি তাই দ্বিমুখী। সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেলের ঢল বাড়ছে, দামও উঁচু। কিন্তু শোধনাগারে হামলা আর ডিজেল রপ্তানির তালা মনে করিয়ে দিচ্ছে, শুধু বেশি তেল বিক্রি করলেই যুদ্ধকালীন জ্বালানি অর্থনীতির হিসাব মেলে না।



