বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া সামলাতে মক্কা চুক্তির পরিকল্পনা কী?

সৌদি আরবের মক্কায় ৭ আগস্ট যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট, সৌদি যুবরাজ এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আলাপ করছে- রয়টার্স
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল অপ্রত্যাশিত। তবে একেবারেই যে বিস্ময়কর, তা নয়। কেউ কেউ এটিকে সুন্নি জোট হিসেবে দেখছেন। এর পেছনে রয়েছে দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার রক্ষণাবেক্ষণকারী সৌদি রাজপরিবারের ভূমিকা, পারমাণবিক অস্ত্রধারী দক্ষিণ এশীয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান এবং ইউরোপের সন্নিকটে অবস্থান করা তুরস্কের রাজনৈতিক ইসলামের শক্তিশালী ধারা। তবে এ চুক্তির সঙ্গে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।
মক্কা চুক্তির অংশীদার তিন দেশের মধ্যে শিল্প, সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে। এই চুক্তিটি, কিংবা এর আগে থেকেই কার্যকর থাকা দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বগুলোর সমন্বিত রূপ, কোনো একক কমান্ড কাঠামোর অধীন সামরিক জোট নয়।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির লক্ষ্য হলো তিনটি শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা।
পাকিস্তান ও সৌদি আরব ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। তখন ধারণা করা হয়েছিল, এর মাধ্যমে রিয়াদ পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ছাতার আওতায় আসবে। তবে বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। মক্কা চুক্তিতে এবার যুক্ত হলো তুরস্কও।
বাহরাইনের বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আলজুনাইদ বললেন, ‘আঞ্চলিক সক্ষমতার এখন একটি কাঠামোগত রূপ নেওয়ার সময় এসেছে।’
তার ভাষায়, ‘এভাবে বলা যায়—এটি ইসলামভিত্তিক নয়। ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করাও এর উদ্দেশ্য নয়। এর উদ্দেশ্য হলো প্রমাণ করা যে অঞ্চলটি নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিজেরাই গড়ে তুলতে পারে। এ অঞ্চলের তিনটি বড় শক্তি হলো পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক। এখন যে বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন, তা হলো এই তিন দেশের প্রভাববলয়ের মধ্যকার ভৌগোলিক দূরত্ব, যা সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।’
তিন দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যেই গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইসলামাবাদ ও আঙ্কারার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব রয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প গবেষণা ও উন্নয়নে পাকিস্তানের জনশক্তিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে—এটি কোনো গোপন বিষয় নয়। তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কান প্রকল্পে প্রায় ২০০ পাকিস্তানি প্রকৌশলী কাজ করছেন। কয়েক দশক ধরে রিয়াদ পাকিস্তানি সেনা ও পাইলটদের ওপর নির্ভর করেছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করেছে এবং দেশটির নাজুক অর্থনীতিকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে এসেছে।
তুরস্ক শুধু পাকিস্তানের কাছে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ নয়। জেএফ-১৭ ব্লক-৩ বহুমুখী যুদ্ধবিমানের মতো কৌশলগত সামরিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তুরস্কের প্রযুক্তিগত অবদান রয়েছে। এ যুদ্ধবিমানে এএসএলপিওডি লক্ষ্যনির্ধারণী ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এতে মুরাদ এএসএ রাডার এবং বোজদোগান স্বল্পপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রও সংযোজন করা যায়।
গত পাঁচ বছরে রিয়াদ ও আঙ্কারা একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে।
আলজুনাইদ উল্লেখ করেছেন, সিরিয়ায় সহযোগিতার মধ্য দিয়ে সৌদি-তুরস্ক সম্পর্ক কৌশলগত গভীরতা পেয়েছে। ওয়াশিংটনও এ সহযোগিতার প্রশংসা করেছিল।
বর্তমানে এ অংশীদারত্ব আরও কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে। সৌদি আরব তার ২০৩০ সালের ভিশন বাস্তবায়নে তুরস্ককে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে। ওই পরিকল্পনায় মোট সামরিক ব্যয়ের ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র, দীর্ঘক্ষণ আকাশে অবস্থান করতে সক্ষম গোলাবারুদ এবং চালকবিহীন আকাশযানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব দেখেছে, বায়কার ও আসেলসানের মতো তুরস্কের কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন ও গবেষণায় তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী। সব মিলিয়ে, এ চুক্তি কোনো জোট নয়, তবে এটি কোনো অগভীর উদ্যোগও নয়।
তবে তিনটি দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বকে একটি একক জোটে রূপ দেওয়া সহজ কোনো বিষয় নয়।
এই সময়ে এসে কেন?
আঙ্কারার ইরান স্টাডিজ সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক ওরাল তোগার মতে, মক্কা চুক্তি নিয়ে দুই বছর ধরে আলোচনা হয়েছে। এর পরিধি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধেরও আগের। তবে চুক্তির সময়টি হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকে ঘিরে চলমান ঘটনাবলির সঙ্গে অবশ্যই সম্পর্কিত।
হরমুজ সংকটের সময় মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। কাতারে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিক থেরোসের মতে, ইরানে ওয়াশিংটনের হামলা মার্কিন নিরাপত্তা ছাতাকেই দায়ে পরিণত করেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সক্ষম হয়নি অথবা বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়নি। ফলে অঞ্চলটির নিরাপত্তা কাঠামোর সামনে আরও একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ইসাম ফারেস ইনস্টিটিউটের ড. ইয়েগিয়া তাশজিয়ান বললেন, ‘সৌদিরা বুঝতে পেরেছে, আব্রাহাম চুক্তি আসলে ইসরায়েলের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, সৌদি আরবের জন্য নয়।’
এ থেকে বোঝা যায়, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তি এই অঞ্চলেই থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে দোহায় ইসরায়েলি হামলারও আগে কাতার তুরস্কের সঙ্গে অংশীদারত্বে বিনিয়োগ করেছিল।
রিয়াদ ও আবুধাবি দুটি ভিন্ন পথ বেছে নেয়। আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও জোরদার করে। ইসরায়েল উপসাগরীয় অঞ্চলে তার আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাইরের স্তর স্থাপন করে।
অন্যদিকে রিয়াদ তার ঐতিহাসিক নিরাপত্তা অংশীদার পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং একই সঙ্গে তুরস্কের সঙ্গে অংশীদারত্বও ধীরে ধীরে শক্তিশালী করতে থাকে।
বিপজ্জনক অস্পষ্টতা
প্রশ্ন হলো, এ চুক্তির উদ্দেশ্য আসলে কত গভীর?
তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কবিষয়ক শীর্ষ বিশেষজ্ঞ ড. গ্যালিয়া লিন্ডারস্ট্রসের মতে, চুক্তিটি একান্তভাবে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এর মাধ্যমে ইরান ও ইসরায়েলকে একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে। সম্ভবত সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও।
অস্পষ্টতা হলো, এ চুক্তি আদৌ কোনো জোট কি না। বিষয়টি বাস্তবে পরীক্ষা করতে হবে। আর সেই প্রক্রিয়া বিপজ্জনক হতে পারে। একটি চুক্তি নিজস্ব সক্ষমতার ঘোষণা। আর একটি জোট হলো জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে অভিন্ন উপলব্ধি এবং এর সঙ্গে একীভূত কমান্ড কাঠামোও জড়িত। ৭ আগস্টের পরও আঞ্চলিক জোটের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।
সৌদি পতাকার অধীনে ইয়েমেনে পাকিস্তানি সেনা ও পাইলটরা বারবার মোতায়েন হয়েছেন। তবে পাকিস্তানের পতাকার অধীনে তারা আমিরাতের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেবেন—এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
২০২৬ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আমিরাতের ৩৫০ কোটি ডলারের বেশি আমানত প্রত্যাহার একটি সতর্কবার্তা ছিল। এতে বোঝা যায়, রিয়াদের প্রতি ইসলামাবাদের আনুগত্যের বাস্তব মূল্য দিতে হতে পারে।
পাকিস্তানিদের মোতায়েন করা আর পাকিস্তান রাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধে নামা এক বিষয় নয়। ইসলামাবাদের নিজস্ব অগ্রাধিকার রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত রিয়াদের প্রতি তার আনুগত্য থাকলেও সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে দেশটি।
ইরানের ক্ষেত্রেও ইসলামাবাদের নিজস্ব অগ্রাধিকার রয়েছে। পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল এবং সিরিয়ায় সাবেক রাষ্ট্রদূত সাঈদ মুহাম্মদ খান উল্লেখ করেছেন, ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এবং বেশ অস্থিতিশীল সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশই বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভিন্ন হুমকির মুখে রয়েছে।
খান বললেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের এক হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে এবং বেলুচদের হুমকি আমাদের অভিন্ন। আগামী এক-দুই-তিন বছরে ধীরে ধীরে আমরা দেখব, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তাদের উপস্থিতি কমিয়ে দক্ষিণ চীন সাগরে মনোযোগ দিচ্ছে। পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।’
তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার বিষয়ে ইসলামাবাদের খুব বেশি আগ্রহ নেই।
একইভাবে আঙ্কারাও ইয়েমেনে সেনা মোতায়েন করে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি নিতে চাইবে—এমনটা সন্দেহজনক। কারণ কুর্দি ইস্যুতে তুরস্কেরও ইরানের সঙ্গে অভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এমনকি রিয়াদও শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দিতে চাইবে না।
ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি অভিযানের সময় এই আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী অবস্থান বারবার ‘যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত’ হয়েছে।
তাহলে কি অভিন্ন হুমকির বিরুদ্ধে এই তিন শক্তি একসঙ্গে সেনা মোতায়েন করবে? বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষরা এই অঙ্গীকারের দৃঢ়তা পরীক্ষা করতে চাইতে পারে। সেটি বিপজ্জনক হতে পারে।
অভিন্ন চ্যালেঞ্জ অবশ্য রয়েছে। এর মধ্যে লোহিত সাগরের পরিস্থিতি অন্যতম।
মোগাদিশুতে তুরস্কের তুর্কসোম সামরিক ঘাঁটি এ অঞ্চলে দেশটির শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পাকিস্তানও এ উপস্থিতিকে শক্তিশালী করছে। সোমালিয়ার সঙ্গে একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে তারা, যার মাধ্যমে সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনী সেখানে অবতরণের সুযোগ পাবে।
একই সময়ে ইসরায়েল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে সুদানের সংঘাতে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত বসোসো বন্দর ও বিমানবন্দরের অবকাঠামো ব্যবহার করে বলে জানা যায়। কখনও কখনও স্থিতাবস্থা ও পরিবর্তনপন্থী শক্তির মধ্যে স্পষ্ট মেরুকরণ দেখা যায়। তবে ন্যাটোর ক্ষেত্রে যেমনটি দেখা যায়, বিষয়টি কখনোই এত সরল নয়।
অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি যৌথ সামরিক পদক্ষেপে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন পরিস্থিতির সমন্বয়ের ওপর।
সব পক্ষেরই নানা ধরনের স্বার্থ রয়েছে। তুরস্ক ও আমিরাতের সামরিক-শিল্প সহযোগিতা শক্তিশালী এবং ক্রমেই বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী ১৬ লাখ পাকিস্তানির পাঠানো অর্থের ওপরও পাকিস্তান এখনও নির্ভরশীল।
সামরিক বিশ্লেষক কামাল আলম যেমনটি উল্লেখ করেছেন, প্রয়োজনের সময় ইসরায়েলকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করার কারণে সৌদি আরব ভারতকে শাস্তি দেবে—এমনটা আশা করা উচিত নয়।
পরিস্থিতি এখন কোন দিকে গড়াবে?
মক্কা চুক্তি একটি অস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। চুক্তির আওতায় থাকা তিনটি প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব এখনও আলাদা ও নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। যে বিষয়টি ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে, তা হলো স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চাওয়া শক্তি এবং পরিবর্তনপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে মেরুকরণ।
আঙ্কারা, মানামা, রিয়াদ ও বৈরুতে আমিরাত-ইসরায়েল জোটকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বর্তমান কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানও বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই মেরুকরণ সমস্যাজনক। বিশেষ করে ইসরায়েলের জন্য, কারণ একই সঙ্গে তাকে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির অস্পষ্টতাও সামলাতে হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে রাজনীতির গুরুত্ব রয়েছে। নির্বাচনও পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।
ড. গ্যালিয়া লিন্ডারস্ট্রসের মতে, আব্রাহাম চুক্তিতে সৌদি আরবকে যুক্ত করা এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বললেন, ‘ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এখন যদি আরও কঠিন না-ও হয়, অন্তত আরও দূরের বাস্তবতা। এটি উদ্বেগের বিষয়, কারণ নেতানিয়াহুর কাছে এটি অগ্রাধিকারের একটি বিষয় ছিল।
লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের কার্যত নিরাপত্তা অঞ্চল কিংবা ইরাক ও ইরানের কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল—যে দিক থেকেই দেখা হোক না কেন, মক্কা চুক্তির তিন স্বাক্ষরকারী দেশের মধ্যে যে বিষয়টি অভিন্ন, তা হলো স্থিতাবস্থা বজায় রাখার অঙ্গীকার।
ইরান স্টাডিজ সেন্টারের তোগা মিডল ইস্ট আইকে বললেন, ‘যেখানে আমিরাত উপ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করেছে, সেখানে তিন স্বাক্ষরকারীই কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে সমর্থন করেছে—সুদানে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) বিরুদ্ধে সুদানের সেনাবাহিনীকে, ইয়েমেনে এসটিসির বিরুদ্ধে স্বীকৃত সরকারকে এবং সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতির বিরুদ্ধে সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে।’
তার ভাষায়, ‘রিয়াদকে এখন আর একা ওই নেটওয়ার্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। ২০২৫ সালের শেষের দিকে ইয়েমেনের সংঘাতের পর এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন। তবে আমি এর গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেখব না।’
ইসলামাবাদ, আঙ্কারা ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশ্লেষকদের মধ্যে এই পর্যবেক্ষণই একটি অভিন্ন ভিত্তি তৈরি করেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে, যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চল থেকে সরে গেলেও মক্কা চুক্তি আঞ্চলিক ভূখণ্ডের বর্তমান কাঠামো রক্ষার একটি অভিপ্রায়ের ঘোষণা।
আরও বড় একটি পরিবর্তন হতে পারে চীনের মধ্যস্থতার বিস্তার। বিশ্লেষক আলজুনাইদ যেমনটি উল্লেখ করেছেন, ইরান ও মক্কা চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দেওয়ার জন্য চীন ভালো অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আলোচনার টেবিলে সবাইকে একত্র করার সক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না।









