মক্কা জোটের বিস্তার ঘটাতে চান এরদোয়ান

সৌদি আরবের মক্কায় গত ৭ আগস্ট ২০২৬ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তাইয়্যেপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে গত সপ্তাহে সই হওয়া যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ভবিষ্যতে আরও দেশকে যুক্ত করার আশা করছেন তিনি। সংঘাতকবলিত অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন এরদোয়ান।
লন্ডনভিত্তিক সংবাদপত্র আশরাক আল-আওসাতকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান বলেছেন, তিন দেশের মধ্যে এই চুক্তি সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে একদিন মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশকে এর আওতায় আনার প্রত্যাশা রয়েছে।
গত সপ্তাহে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি করা হয়।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, পরবর্তী ধাপে মিসরও এই চুক্তিতে যোগ দিতে পারে। তার মতে, এ ক্ষেত্রে কয়েকটি কারিগরি বিষয় সমাধান হওয়া বাকি। তবে মিসর এখনো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। ফিদান বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কায়রো সফর করবেন।
তুরস্ক ও মিসরের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা জোরালো হলেও নতুন এই নিরাপত্তা জোটে কায়রো যোগ দেবে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি। চুক্তিতে ন্যাটোর আদলে একটি ধারা রয়েছে, যেখানে কোনো সদস্য দেশে হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
এরদোয়ান বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিই এই চুক্তির জন্ম দিয়েছে। আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিতে চাইছে। তার ভাষায়, আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান আঞ্চলিক দেশগুলোকেই করতে হবে এবং বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো ব্যবস্থা এ অঞ্চলে বিপর্যয় ডেকে আনে।
৫৭ সদস্যের ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) চুক্তিটিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন ও সোমালিয়াসহ কয়েকটি দেশও চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ইরানও আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, চুক্তিটি পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের উদ্দেশ্যে করা হয়নি। তার মতে, এর লক্ষ্য অঞ্চলে শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছিল। ওই চুক্তিতেও কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়। পরে তুরস্ককে এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার আলোচনা শুরু হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। অন্যদিকে গাজা যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চলা কূটনৈতিক প্রচেষ্টাতেও ভূমিকা রাখছে তুরস্ক।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এরদোয়ানের অভিযোগ
এদিকে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠকের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন ইস্যুকে বিশ্ব আলোচনার বাইরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ করেছেন এরদোয়ান।
এরদোয়ান বলেছেন, বিশৃঙ্খলা ও নতুন সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়াই নেতানিয়াহু সরকারের লক্ষ্য। তবে ইসরায়েল যা-ই করুক, ফিলিস্তিনের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তুরস্ক কাজ করে যাবে বলেও জানিয়েছেন এরদোয়ান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি সরকারের কঠোর সমালোচনা করে আসছেন।
মঙ্গলবার আঙ্কারায় পৌঁছান মাহমুদ আব্বাস। বুধবার এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠককে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেছেন আব্বাস।
ফিলিস্তিনে দীর্ঘদিন পর আইনসভা ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তের বিষয়েও আশাবাদ জানিয়েছেন এরদোয়ান। তার মতে, এই নির্বাচন ফাতাহ ও গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা হামাসের দীর্ঘদিনের বিরোধ নিরসনের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
তিন দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তিকেও স্বাগত জানিয়েছেন আব্বাস। তিনি বলেছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র : ডন






