প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন
ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি পেয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ইউক্রেন

তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে জেলেনস্কি ও ট্রাম্প- রয়টার্স
মার্কিন প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন ভলোদিমির জেলেনস্কি। একে কিয়েভের জন্য বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করতে অন্তত এক বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। আর এই সময়টায় প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র সংকট চলতে থাকায় কিয়েভের সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। রাশিয়ার ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও জ্বালানি অবকাঠামো হামলার মুখে তারা ঠিক কোনগুলো আগে বাঁচাবে।
গত বুধবার আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প এই প্রতিশ্রুতি দেন। এটি ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বার্তা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে তাদের মধ্যকার তিক্ত সম্পর্কের পর এক নাটকীয় উন্নতির ইঙ্গিত। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত জরুরি। কারণ জেলেনস্কির মতে, স্থলযুদ্ধে সুবিধা করতে না পেরে রাশিয়া এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জোর খাটিয়ে ইউক্রেনকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। ইউক্রেনের অস্ত্রাগারে প্যাট্রিয়টই একমাত্র অস্ত্র, যা মস্কোর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রুখে দিতে সক্ষম। চলতি মাসে রাশিয়ার ছোড়া ৫৪টি অতিগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে মাত্র ৪টি ভূপাতিত করতে পেরেছে কিয়েভ।
তবে ট্রাম্পের এই প্রতিশ্রুতিতে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন এবং রেথিয়নের সঙ্গে তিনি আগে কথা বলেননি। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নতুন সংযোজন প্ল্যান্ট তৈরি এবং সাব-কন্ট্রাক্টরদের সংগঠিত করতে যে সময় লাগবে, তাতে রেথিয়নের পিএসি-২ বা লকহিডের আরও আধুনিক পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন খুব দ্রুত শুরু করা সম্ভব নয়।
অসলোর নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজের ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হফম্যানের মতে, ‘স্বল্পমেয়াদে এর প্রভাব হবে অত্যন্ত সীমিত। উৎপাদন শুরু হতে যদি ১২ মাসের কম সময় লাগে, তবে আমি অবাক হব। আমার ধারণা, সময় আরও বেশি লাগবে।’
উদাহরণস্বরূপ, রেথিয়ন ২০২৪ সালে জার্মানিতে পিএসি-২ সিস্টেমের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য ইউরোপীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থা এমবিডিএর সঙ্গে চুক্তি করেছিল। এর প্রথম চালান ২০২৭ সালের আগে আশা করা যাচ্ছে না।
২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে ইউক্রেন তাদের সামরিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ঘটিয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার প্রযুক্তি তৈরি করা ক্ষেপণাস্ত্র বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সের্হি বেসক্রেস্টনভ জানান, দুষ্প্রাপ্য যন্ত্রাংশগুলোর উৎপাদন বাড়াতে সাব-কন্ট্রাক্টরদের কতদিন লাগবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এই প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে জার্মানি ইউক্রেনকে সাহায্য করতে পারে। কারণ তাদের নিজস্ব পিএসি-২ উৎপাদন চেইন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের মতে, নতুন ইন্টারসেপ্টরগুলো প্রাথমিকভাবে জার্মানি বা অন্য কোনো নিরাপদ ইউরোপীয় দেশে তৈরি হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলে উৎপাদন ইউক্রেনে স্থানান্তর করা হতে পারে। অবশ্য জেলেনস্কি জানিয়েছেন, কারিগরি দলগুলো দ্রুত এর বিবরণ চূড়ান্ত করবে। তিনি চান যত দ্রুত সম্ভব ইউক্রেনের মাটিতেই উৎপাদন শুরু হোক। পাশাপাশি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিএসি-৩-এর একটি চালান পৌঁছাবে বলেও তিনি আশা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক হুমকির তুলনায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক উৎপাদন অপর্যাপ্ত। রাশিয়া বছরে অন্তত ৭০০ থেকে ৮০০টি ইস্কান্দার ও কিঞ্জাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শতভাগ ধ্বংস করতে অন্তত ৩টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে রাশিয়ার হামলা ঠেকাতে বছরে প্রায় ২,৪০০টি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র লাগবে।
হফম্যানের মতে, ইউক্রেনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কারখানা করলেও এই সংখ্যায় পৌঁছানো অসম্ভব। কারণ লকহিড গত বছর মাত্র ৬০০টির মতো পিএসি-৩ তৈরি করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তা দুই হাজারে নেওয়ার লক্ষ্য। সেখানে ইউক্রেনের একটি কারখানা বছরে বড়জোড় ২০০ থেকে ৩০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে।
বাস্তবতা বিবেচনা করে জেলেনস্কি নিজেই জানিয়েছেন ইউক্রেনের একটি বিকল্প পরিকল্পনা প্রয়োজন। তিনি আশা করছেন, ইউক্রেনীয় কোম্পানি ফায়ার পয়েন্টের নেতৃত্বে ইউরোপীয় মিত্ররা শিগগিরই ফ্রান্সে বৈঠকে বসবে।
রাশিয়ার এই ভয়াবহ বিমান হামলার মুখে ইউক্রেনের সামনে পথ খুবই সংকীর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সব লক্ষ্যবস্তু রক্ষা করা অসম্ভব। তাই ইউক্রেনকে এখন শুধু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বেছে নিতে হবে। ইউক্রেন এরই মধ্যে তাদের জ্বালানি ও সামরিক উৎপাদন কারখানাগুলো মাটির নিচে বা কংক্রিটের সুরক্ষিত কাঠামোর ভেতরে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই মুহূর্তে ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে সেরা রক্ষণাত্মক বিকল্প হতে পারে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে না গিয়ে রাশিয়ার ভেতরে আরও জোরালো হামলা করা।




