সঞ্চালন জটিলতায় আটকা নেপালের বিদ্যুৎ

ফাইল ছবি
ভারতের আপত্তির কারণে নয়, মূলত সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা পরীক্ষা শেষ না হওয়ায় নেপাল থেকে আপাতত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারছে না বাংলাদেশ। এখন এই বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হবে অন্তত এক বছর। গতকাল রবিবার নেপালের কাঠমান্ডু পোস্টের এক খবরে বলা হয়, ভারত অনুমোদন না দেওয়ায় বাংলাদেশে নেপালের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি আটকে গেছে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করীমের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘ভারতের আপত্তির কারণে বিদ্যুৎ আমদানি না হওয়ার কথা সঠিক নয়। মূল কারণ হলো, ওই বিদ্যুৎ ভারতের ওপর দিয়ে আনতে যে সঞ্চালন লাইন রয়েছে, তার সক্ষমতা নিয়ে টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস চলছে। আশা করি, এটা শিগগির শেষ হবে। এরপর বাকি আরও কয়েকটি প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলোও শেষ করা হবে।’
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেপাল প্রথম মাত্র ১২ ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছিল। এরপর প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করছে। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় নেপাল-ভারত জ্বালানি সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির (জেএসসি) বৈঠকে অতিরিক্ত আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশ ও নেপাল নীতিগতভাবে সম্মত হয়। ওই বৈঠকে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলো এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও একটি বোঝাপড়া হয়েছিল। এরপর ভারতের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
পিডিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সীমান্ত না থাকায় সেখান থেকে বিদ্যুৎ আনতে হবে ভারতের ওপর দিয়ে। সেজন্য অতিরিক্ত এই বিদ্যুৎ আমদানি করতে আগের মতোই বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির পাশাপাশি জ্বালানি সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির (জেএসসি) সিদ্ধান্তের মতো আরও কিছু আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন রয়েছে। এর পরই মূলত ওই বিদ্যুৎ আনা যাবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, সব প্রক্রিয়া শেষে কিছুটা সময় লাগবে। সেজন্য চলতি বছর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আনার সম্ভাবনা খুবই কম। অপেক্ষা করতে হবে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত। কারণ, নেপাল সাধারণত বর্ষা মৌসুমে তাদের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ভারত ও বাংলাদেশে রপ্তানি করে। তবে শীতকালে নিজেদের চাহিদা মেটাতে নেপালকে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয়। নেপালের জ্বালানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণ দেখিয়ে নেপাল থেকে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াটের বাইরে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন স্থগিত করেছে। ফলে ১৫ জুন থেকে বাংলাদেশে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারছে না নেপাল।
নেপালের এই বিদ্যুৎ ধলকেবার-মুজাফফরপুর ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে বহরমপুর-ভেড়ামারা ৪০০ কেভি লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পৌঁছায়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির কয়েকজন কর্মকর্তা জানালেন, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে দেশের অভ্যন্তরে যে সঞ্চালন রয়েছে, তার সক্ষমতার কোনো ঘাটতি নেই। মূলত ভারতীয় অংশের সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে এই বিদ্যুৎ আমদানি।
বর্তমানে বাংলাদেশে রপ্তানি অনুমোদিত ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেপালের ‘ত্রিশূলী’ এবং ‘চিলিম’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত হচ্ছে। এই প্রকল্পগুলো ভারতেও বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও একই প্রকল্পগুলো থেকে রপ্তানি হওয়ার কথা ছিল।
নেপাল এ পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশে সম্মিলিতভাবে মোট ১ হাজার ১৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। ভারতের সঙ্গে নেপাল ভারতীয় রুপিতে বিদ্যুৎ বিক্রি করলেও বাংলাদেশের সঙ্গে লেনদেন হয় মার্কিন ডলারে।
নেপাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, তারা বাংলাদেশের কাছে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ দশমিক ৪০ মার্কিন সেন্ট মূল্যে বিক্রি করছে। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের ক্ষেত্রেও একই হার প্রযোজ্য হওয়ার কথা ছিল।


