বাংলাদেশে জাপানি গাড়ির বাজার দখল করছে চীন

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে ‘গাড়ি’ মানেই দীর্ঘকাল ধরে মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্তের চোখে ভেসে ওঠে জাপানি ব্র্যান্ড টয়োটার নাম। করোলা, এক্সিও, এলিয়ন, প্রিমিও মডেলগুলো দশকের পর দশক এ দেশের সড়কে একচেটিয়া রাজত্ব করেছে। তবে সময়ের চাকায় লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। দীর্ঘদিনের এই জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির সাম্রাজ্যে হানা দিয়েছে চীন। রিকন্ডিশন্ড নয়, ঝকঝকে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি, চোখধাঁধানো ইন-কার টেকনোলজি আর সাশ্রয়ী দামের ওপর ভর করে দেশের ব্যক্তিগত গাড়ি বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে চীনের দিকে চলে যাওয়ার প্রবণতা।
জ্বালানি সংকট সামাল দিতে দেশের আমদানিনীতিতে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে সরকার। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির চেয়ে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ি আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যেখানে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) আমদানিতে শুল্কহার কমানো হয়েছে, ঠিক বিপরীতে বাড়ানো হয়েছে জাপানি রিকন্ডিশন্ড বা ব্যবহৃত গাড়ির শুল্ক। সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে চীনের ব্র্যান্ড নিউ হাইব্রিড, প্লাগইন হাইব্রিড এবং ইভি গাড়িগুলো পেল বাংলাদেশের বাজারে ঢোকার নতুন রসদ।
দেশের ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারের এখনো ৮৫ শতাংশই জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর দখলে। আগে যেটি শতভাগ ছিল। এই ১৫ শতাংশের বেশিরভাগই চীনা গাড়ি। নতুন আমদানি করা গাড়ির তালিকায় এখন চীনা ব্র্যান্ডগুলোর আধিপত্য স্পষ্ট। জাপানি একটি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির চেয়েও কম দামে মিলছে চীনের একদম ঝকঝকে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি। শুধু দামই নয়, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শক্তিশালী ব্যাটারি, আধুনিক ডিজাইন এবং অবিশ্বাস্য জ্বালানি সাশ্রয়ের কারণে ক্রেতারা এখন শোরুমে খুঁজছেন চীনা গাড়ি।
ইলেকট্রিক ভেহিক্যালে চীনের বিওয়াইডি বিশ্ব জুড়েই বাজিমাত করেছে। সেই ব্র্যান্ডের গাড়ির চট্টগ্রামে অনুমোদিত ডিলার অটোটেক। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল কবির খান শান্ত বললেন, ‘গত এক বছরে আমরা ৫০টির বেশি গাড়ি বিক্রি করেছি। বিক্রীত গাড়িতে কোনো অভিযোগ আসেনি, এটাই বড় প্রাপ্তি। আমাদের টার্গেটের চেয়ে ক্রেতা চাহিদা বেশি। বোঝাই যাচ্ছে, আস্থা বেড়েছে বলেই এ বাড়তি চাহিদা।’ তার আশাবাদ, দেশ জুড়ে গাড়ির চার্জিং স্টেশনগুলো যদি তৈরি হয়ে যায়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে রিকন্ডিশন্ড এবং ব্র্যান্ড নিউ গাড়ির বাজার ফিফটি ফিফটি হবে।
বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে জাপানি গাড়ি টয়োটার আধিপত্যের মূল চাবিকাঠি হলো এর পুনঃবিক্রয় মূল্য বা রিসেল ভ্যালু, স্থায়িত্ব এবং হাতের নাগালে খুচরা যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা। এ দেশের ভাঙাচোরা রাস্তা আর প্রতিকূল আবহাওয়ায় জাপানি ইঞ্জিনের নির্ভরযোগ্যতা যুগের পর যুগ ধরে প্রমাণিত। তা ছাড়া দেশের যেকোনো প্রান্তের সাধারণ মেকানিকও এই গাড়িগুলো অনায়াসে মেরামত করতে পারেন।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড কার ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত বা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার মতো। এই খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। একসময় দেশে বছরে ২০ থেকে ৩০ হাজার রিকন্ডিশন্ড গাড়ি বিক্রি হলেও এখন সেটি ৯ হাজারে নেমেছে। বিক্রিতে ধস নামায় রাজস্ব দেওয়ায় শীর্ষ থাকা এই খাত থেকে সরকারি রাজস্বও কমেছে। উচ্চ শুল্ক হারের কারণে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বাজার থেকে সরকার প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে।
বারভিডার সাবেক প্রেসিডেন্ট হাবিব উল্লাহ ডন বলছিলেন, ‘উচ্চ শুল্ক, ব্যাংক ঋণ দিতে কড়াকড়ি এবং সরকারের বৈষম্যনীতির কারণে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসা বিপদে পড়েছে। ইভির মতো রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড, প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়িগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ী। কিন্তু সরকার ইভিকে সুবিধা দিলেও আমাদের দেয়নি। ফলে রাজস্বও কম পাচ্ছে সরকার। আশা করছি, ব্যবসাবান্ধব এই সরকার বাজেট পাসের আগেই ট্রেডের স্বার্থেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে।’
যে ইভিগুলো বাংলাদেশে বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোর দাম ৬০ লাখ টাকার ওপর। ফলে জাপানের টয়োটা ব্র্যান্ডের হেরিয়ার মানের এই ইভি কিনতে পারছেন ক্রেতারা। জাপানি এক্সিও, প্রিমিও, এলিয়ন গাড়ির মানের ইভি এখনো দেশে আসেনি। জাপানি ইয়ারিস সেডান কারের দাম ৬০ লাখ টাকা। অন্যদিকে, চীনের বিওয়াইডি সিল ফাইভ মডেলের ব্র্যান্ড নিউ গাড়ির দাম ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ অনেক কম দামে মিলছে নতুন চীনা গাড়ি। এমনকি টয়োটা অ্যাকুয়াকে টেক্কা দিতে বিওয়াইডি আনছে ২৫ লাখ টাকার গাড়ি। সেই গাড়ি বাজারে এলে জনপ্রিয় হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
জাপানি গাড়ির বাজার ধরতে পাঁচটির মতো বাংলাদেশি শিল্পগ্রুপ চীনের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ব্যক্তিগত গাড়ি আমদানি করছে। এর মধ্যে বিওয়াইডি আমদানি করছে সিজি রানার গ্রুপ। র্যানকন মোটরস করছে এমজি ব্র্যান্ডের। এইচ অটোস করছে হ্যাভাল ও গ্রেটওয়াল। এশিয়ান মোটর স্পেক্স করছে চেরি ওমাডা ব্র্যান্ডের গাড়ি। এর মধ্যে বেশি জনপ্রিয় বিওয়াইডি ও এমজি ব্র্যান্ড।
জাপানের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্ববাজারে চীন জাপানকে টপকে গেছে। ২০২৫ সালে চীনা গাড়ি নির্মাতারা রেকর্ড প্রায় ২৭ মিলিয়ন (২ কোটি ৭০ লাখ) যানবাহন বিক্রি করেছে। অন্যদিকে, এতদিন শীর্ষে থাকা জাপানের গাড়ি বিক্রির পরিমাণ স্থবির হয়ে ২৫ মিলিয়নে (২ কোটি ৫০ লাখ) এসে থমকে গেছে। ২০২৫ সালে চীনে মোট উৎপাদিত গাড়ির প্রায় ৭৪ শতাংশই (প্রায় ২ কোটি ১ লাখ গাড়ি) অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি করেছে। ২৬ শতাংশ রপ্তানি করেছে বিভিন্ন দেশে।
এত বিপুল পরিমাণ গাড়ি কোন দেশে যাচ্ছে, সেটি জেনে নেওয়া যাক। চায়না প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশন বলছে, রপ্তানি হওয়া বৈদ্যুতিক গাড়ির শীর্ষ পাঁচটি গন্তব্য দেশ হলো বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও থাইল্যান্ড। ২০২৫ সালে চীন থেকে বেলজিয়ামে ইভি রপ্তানি হয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ইউনিট। যুক্তরাজ্যে গেছে ২ লাখ ৩১ হাজার। মেক্সিকোয় গেছে ২ লাখ ২১ হাজার। ব্রাজিলে গেছে ২ লাখ। থাইল্যান্ডে গেছে ১ লাখ ৫১ হাজার।


