অনলাইন গেমের নেশায় প্রাণ দিল তিন বোন

সংগৃহীত ছবি
ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে অনলাইন গেম খেলতে নিষেধ করায় তিন কিশোরী বোন নবম তলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গেমিং আসক্তি নিয়ে বাবা-মায়ের আপত্তির পর তারা এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
নিহতরা হলেন গাজিয়াবাদের ভারত সিটি আবাসিক এলাকার চেতন কুমারের মেয়ে পাখি (১২), প্রাচি (১৪) ও বিশিকা (১৬)। একটি ফ্ল্যাটে পরিবারের সঙ্গে থাকত তারা।
পুলিশ জানায়, সোমবার ভোররাতে তিন বোন ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে জানালা দিয়ে একে একে নিচে লাফ দেয়। রাত আনুমানিক ২টার দিকে বিকট শব্দে আশপাশের বাসিন্দারা জেগে ওঠেন। নিরাপত্তাকর্মী ও প্রতিবেশীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে পরিবারের সদস্যরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলেও ততক্ষণে তিন বোনই নিচে ঝাঁপ দিয়েছে।
ঘটনার কারণ হিসেবে জানা যায় , করোনা অতিমারির সময় স্কুল বন্ধ থাকাকালীন মোবাইল ও অনলাইন গেমের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে ওই তিন কিশোরীর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঝোঁক চরম নেশায় পরিণত হয়। এমনকি গেম খেলার জন্য তারা মাঝেমধ্যে স্কুলেও যেত না বলে জানা গিয়েছে।
সম্প্রতি তারা একটি নির্দিষ্ট ‘টাস্ক-বেসড’ অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছিল, যেখানে প্রতিটি ধাপ পার করার জন্য চ্যালেঞ্জিং কাজ দেওয়া হতো।
মঙ্গলবার রাতে ওই গেম খেলা নিয়েই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাদানুবাদ হয় তিন বোনের। বাবা-মা তাদের ফোন কেড়ে নেন এবং গেম খেলতে নিষেধ করেন। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে, এই বকুনি সহ্য করতে না পেরেই চরম সিদ্ধান্ত নেয় তারা। রাত গভীর হলে আবাসনের ১০ তলার বারান্দা থেকে তিন বোন একসঙ্গে নীচে ঝাঁপ দেয়। শব্দ শুনে নিরাপত্তারক্ষী ও বাসিন্দারা ছুটে এসে তাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান।
ঘটনার পর তিন বোনের পকেট ডায়েরিতে লেখা আট পৃষ্ঠার একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে তারা বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং তাদের গেমিং কার্যকলাপের বিস্তারিত লিখেছে। চিরকুটে তারা অনুরোধ করেছে, ডায়েরিতে লেখা সবকিছু মনোযোগ দিয়ে পড়তে, কারণ সেখানেই ‘সত্য’ লেখা আছে।
এক জায়গায় লেখা, ‘এই ডায়েরিতে যা লেখা আছে সব পড়ে নিও, কারণ এগুলোই সত্য। এখনই পড়ো। আমি সত্যিই দুঃখিত। সরি, পাপা।’ লেখার শেষে ছিল কান্নার ইমোজি।
এ ছাড়া তাদের ঘরের দেয়ালে লেখা ছিল, ‘আমি খুব, খুব একা।’
তাদের দ্রুত লোনির একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তিনজনকেই মৃত ঘোষণা করেন বলে জানান এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা।
গাজিয়াবাদের টিলা মোড় থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহগুলি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা এটি আত্মহত্যা, তবে এর পেছনে অন্য কোনো প্ররোচনা বা ওই ‘টাস্ক-বেসড’ গেমটির কোনো নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিসিপি (গাজিয়াবাদ) জানিয়েছেন, “আমরা মেয়েদের মোবাইল ফোনটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলেই মৃত্যুর সঠিক কারণ স্পষ্ট হবে।”
এই ঘটনাটি আবারও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অনলাইন গেমের আসক্তি এবং তার মারাত্মক পরিণতি নিয়ে বড়সড়ো প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মনোবিদদের মতে, সন্তানদের ডিজিটাল আসক্তি কমাতে শাসন নয়, বরং বন্ধুর মতো পাশে থাকা এবং পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন।
ঘটনার পর তিন বোনের পকেট ডায়েরিতে লেখা আট পৃষ্ঠার একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে তারা বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং তাদের গেমিং কার্যকলাপের বিস্তারিত লিখেছে। চিরকুটে তারা অনুরোধ করেছে, ডায়েরিতে লেখা সবকিছু মনোযোগ দিয়ে পড়তে, কারণ সেখানেই ‘সত্য’ লেখা আছে।
এক জায়গায় লেখা, ‘এই ডায়েরিতে যা লেখা আছে সব পড়ে নিও, কারণ এগুলোই সত্য। এখনই পড়ো। আমি সত্যিই দুঃখিত। সরি, পাপা।’ লেখার শেষে ছিল কান্নার ইমোজি।
এ ছাড়া তাদের ঘরের দেয়ালে লেখা ছিল, ‘আমি খুব, খুব একা।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, তিন বোন একটি অনলাইন টাস্কভিত্তিক কোরিয়ান গেমে আসক্ত ছিল। কোভিড মহামারির সময় থেকেই তাদের এই আসক্তি শুরু হয়।
তারা নিজেদের কোরিয়ান নামও রেখেছিল এবং গেমে দেওয়া বিভিন্ন ‘টাস্ক’ অনুসরণ করত। চিরকুটে তারা লিখেছে, ‘আমরা কোরিয়া ছাড়তে পারি না। কোরিয়াই আমাদের জীবন। তোমরা আমাদের মুক্ত করতে পারবে না। আমরা আমাদের জীবন শেষ করছি।’
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অনলাইন গেমটি এই আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। খতিয়ে দেখা হচ্ছে, কোনো ইন-গেম টাস্কের সঙ্গে এই ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না। জানা গেছে, মেঝো বোন প্রাচি অন্য দুই বোনকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল।
তিন বোনের বাবা চেতন কুমার বলেন, তিনি যদি আগে গেমটির কথা জানতেন, তাহলে কখনোই তাদের খেলতে দিতেন না। তিনি বলেন, ‘যা হয়েছে, তা ভয়াবহ। আমি চাই না এমন ঘটনা আর কোনো শিশুর সঙ্গে ঘটুক। আমি অভিভাবকদের অনুরোধ করব, সন্তানদের ভিডিও গেম থেকে দূরে রাখুন।’
ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ নিমিশ পাতিল জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, গত দুই বছর ধরে তিন বোন স্কুলে যেত না। দুর্বল ফলাফল ও আর্থিক সমস্যার কারণে তারা ঘরেই থাকত। সম্প্রতি পরিবার তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। তবে আত্মহত্যার সঠিক কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
সূত্র : উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন

