জেগে উঠছে ইরানের ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি
- যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার হামলা যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় মাটিচাপা পড়া কয়েকটি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ফের সচল করে ফেলেছে ইরান। ফলে ইসরায়েল ও পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোকে নিশানা বানানোর সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে দেশটি। সিএনএনের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্র বলছে, ইরান বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাকের মতো সাধারণ নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করে কাটিয়ে উঠছে সেই হামলার ক্ষত। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এই সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু সুড়ঙ্গের মুখে বোমা ফেলে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর টানা কয়েক সপ্তাহের হামলায় ইরানের অনেক ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির প্রবেশপথ ও সড়ক ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে সেখানে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা বলেছে। তবে সেটি বাস্তবায়ন হতে হতে কেটে যাবে কয়েক মাস। এর মধ্যে যদি আবার সংঘাত শুরু হয়, তাহলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করবে ইরান। এমনটাই মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের জেমস মার্টিন সেন্টার ফর নন-প্রোলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কাজ করা এই বিশ্লেষক বললেন, ‘যতক্ষণ তাদের কাছে উৎক্ষেপণযন্ত্র ও প্রশিক্ষিত ক্রু থাকবে, ততক্ষণ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে পারবে। এমনকি উৎপাদন বন্ধ থাকলেও। তার ভাষায়, ইরানিদের কাছে এখনো যে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ আছে, সেগুলো দিয়ে উৎক্ষেপণযন্ত্রগুলো সচল করতে কোনো বেগ পেতে হবে না তাদের।
যুদ্ধ চলাকালে প্রবল ঝুঁকি নিয়েই টানেলের প্রবেশপথ আবার সচল করার কাজ এগিয়ে নিতে থাকে ইরান। এ কারণে যুদ্ধের পুরোটা সময় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয় তারা। প্রায় সাত সপ্তাহ আগে (৮ এপ্রিল) যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরানের পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও গতি পায়।
সিএনএনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার ৬৯টি প্রবেশপথে হামলা চালায়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫০টি পথ আবার চালু করে ফেলেছে ইরান। এসব ঘাঁটির অন্যান্য অবকাঠামোও মেরামত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান চলাচল ঠেকাতে যেসব সড়কে বোমা ফেলে বড় বড় গর্ত তৈরি করা হয়েছিল, এর অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। এমনকি দুটি স্থানে ঢালাইও করা হয়েছে নতুন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারই এই যুদ্ধের অন্যতম কারণ। সেটি ধ্বংস করা ছিল তার মূল লক্ষ্যগুলোর একটি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে অধিকাংশ টানেলের প্রবেশপথ। সেখানে যাওয়ার সড়কগুলোও ভেঙে যায়। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিতে আরও দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ ইস্পাহান নর্থ মিসাইল ঘাঁটির মতো স্থাপনাগুলো হামলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। টানেল ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেছে এবং বাইরে থাকা উৎক্ষেপণযান ধ্বংস হয়েছে। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির পরযুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বললেন, ‘ইরানকে এখন অবশিষ্ট উৎক্ষেপণযন্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র মাটি খুঁড়ে বের করতে হবে। কিন্তু সেগুলো প্রতিস্থাপনের কোনো সক্ষমতা নেই তাদের। ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।’ তবে বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, ইরানের ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোয় এখনো প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে।
গোরুক শহর ও কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা রবিবার ইরানের গোরুক শহর ও কেশম দ্বীপে রাডারসহ ড্রোনসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানায় তারা। সেন্টকম বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি মার্কিন এমকিউ-১ ড্রোনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়াসহ ইরানের ‘আগ্রাসী পদক্ষেপের’ জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এ হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে আইআরজিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে দক্ষিণ ইরানে হামলা চালাতে ব্যবহৃত একটি যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে তারা। তবে ঘাঁটিটি কোথায় অবস্থিত, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।







