৩৪ কোটি টাকার ‘ব্লাড মানি’ দিয়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পেলেন ভারতীয় যুবক

দীর্ঘ কারাবাস শেষে কেরালায় ফিরেছেন আবদুল রহিম। ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবে দীর্ঘ ২০ বছরের কারাবাস শেষে মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পেয়েছেন ভারতের কেরালার কোঝিকোড়ের বাসিন্দা আবদুল রহিম। নিহত এক নাবালকের পরিবারকে ‘ব্লাড মানি’ বা ‘দিয়াহ’ হিসেবে প্রায় ১৫ লাখ সৌদি রিয়াল, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পরিশোধের পর তাকে ক্ষমা করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
গত বৃহস্পতিবার ভোরে রিয়াদ থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে কোঝিকোড়ের কারিপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। দীর্ঘ দুই দশক পর দেশে ফেরায় তার পরিবার ও এলাকায় তৈরি হয়েছে আনন্দের পরিবেশ।
প্রতিবেদন বলছে, ইসলামি আইন অনুযায়ী অনিচ্ছাকৃত হত্যার ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর শাস্তি থেকে মুক্তির সুযোগ থাকে, যা ‘দিয়াহ’ নামে পরিচিত।
আবদুল রহিমের মুক্তির জন্য অর্থ সংগ্রহ অভিযান চালিয়েছেন সৌদি আরবে বসবাসরত ভারতীয়রা। এতে অংশ নেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা মালয়ালিরাও। ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়েই পরিশোধ করা হয় ক্ষতিপূরণ।
জানা যায়, ২০০৬ সালে সৌদি আরবে যান আবদুল রহিম। প্রথমে অটোচালক হিসেবে কাজ করলেও পরে বেশি আয়ের আশায় ১৫ বছর বয়সী এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত কিশোরের ব্যক্তিগত চালক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য একটি বাহ্যিক চিকিৎসা যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল ওই কিশোর।
সংবাদ সংস্থা এএনআই বলছে, ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনাবশত রহিমের হাত চিকিৎসা যন্ত্রে লেগে যায়। এতে যন্ত্রটি বিচ্ছিন্ন হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে কিশোরটি এবং পরে মারা যায়। সৌদি আরবে পৌঁছানোর মাত্র ২৮ দিনের মাথায় গ্রেফতার করা হয় রহিমকে।
বিচার চলাকালে রহিম দাবি করছিলেন, গাড়ি চালানোর সময় তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছিল কিশোরটি। পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত যন্ত্রে হাত লেগে যায়। তবে আদালত তার এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি। ২০১১ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে ২০২২ সালে আপিল আদালতও সেই রায় বহাল রাখে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালে নিহত কিশোরের পরিবার ১৫ লাখ সৌদি রিয়াল ক্ষতিপূরণ নিয়ে রহিমকে ক্ষমা করতে সম্মত হয়। এরপর ২০২৪ সালের ২ জুলাই তার মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাহার করেন সৌদি আদালত। তবে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগের নির্দেশ দেওয়া হয়। আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গত ২০ মে তার সাজা শেষ হয়।
এদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে ইয়েমেনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কেরালার আরেক নাগরিক নিমিশা প্রিয়ার মামলাও নতুন করে এসেছে আলোচনায়।
২০০৮ সালে নার্সিং কাজের জন্য ইয়েমেনে যান নিমিশা। পরে স্বামী টমি থমাস ও মেয়েকে নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন তিনি। ২০১৪ সালে তার স্বামী ও সন্তান ভারতে ফিরে গেলেও তিনি থেকে যান ইয়েমেনেই।
পরবর্তীতে ইয়েমেনি নাগরিক তালাল আব্দো মাহদির সঙ্গে পরিচয়ের পর যৌথভাবে একটি ক্লিনিক পরিচালনা শুরু করেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, মাহদি তার পাসপোর্ট ও অর্থ কেড়ে নেন এবং তাকে নির্যাতনও করেন। প্রশাসনিক নথিতে নিমিশাকে স্ত্রী হিসেবে দেখিয়ে তার চলাচল ও আইনি সহায়তাও সীমিত করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
২০১৭ সালের ২৫ জুলাই পাসপোর্ট ফেরত পেতে ও পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা হিসেবে নিমিশা মাহদিকে ঘুমের ইনজেকশন দেন। অতিরিক্ত ডোজে মাহদির মৃত্যু হলে দেশ ছাড়ার সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৮ সালে ইয়েমেনের আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
বর্তমানে ইয়েমেনের কারাগারে বন্দি রয়েছেন তিনি । তার মুক্তির জন্য পরিবার ও বিভিন্ন সংগঠন কূটনৈতিক এবং আইনি উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। ‘ব্লাড মানি’ হিসেবে প্রায় দেড় কোটি টাকা এবং আইনজীবীর ফি বাবদ আরও প্রায় দেড় কোটি টাকার দাবি উঠেছে।
নিমিশার মৃত্যুদণ্ড ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। এখন পর্যন্ত ইয়েমেন সরকার এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ভারতের পক্ষ থেকেও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।






