ককরোচ আন্দোলন
প্রথমবার পিছু হটল মোদি সরকার, ভবিষ্যৎ কোন পথে

ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একজন অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই দেখা হয়েছে। বিরোধীদের কোণঠাসা করে রাখা, জনমত নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া এবং ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত করার অভিযোগের মধ্যেই তাঁর সরকার এগিয়েছে। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের জেন-জি আন্দোলন এমন একটি সাফল্য পেল, যা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও কোন বিরোধী রাজনৈতিক দল আদায় করতে পারেনি।
নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে কয়েকদিন ধরে হাজার হাজার ছাত্র-যুব দিল্লির জন্তর মন্তরে আন্দোলনে নেমেছিলেন। ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের( প্রাক্তন) পদত্যাগ। টানা ৩৬ দিনের অবস্থান বিক্ষোভ এবং সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুর ২৬ দিন অনশনের পর ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগে যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় পতাকা হাতে নাচ, গান, স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল জন্তর মন্তর।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি অনেক বড় বড় গণআন্দোলন সুকৌশলে সামাল দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে মোদি সরকারের জন্য বিরল রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দৃঢ় নেতৃত্বের ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ২২ বছরের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অক্ষিত ত্যাগীর কথায়,'এক সপ্তাহ আগেও সরকারকে কিছু বলার সুযোগ মাত্র ছিল না। এখন মানুষ বুঝতে পারছে যে, সরকারের কাছে দাবি জানানো যায় এবং তার ফলও পাওয়া সম্ভব।'
সাম্প্রতিক কয়েক বছরে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশে যুব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিবর্তনের নজির তৈরি হয়েছে । সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবার ভারতের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন ‘ককরোচ’ আন্দোলনও কি দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে?
‘আন্দোলনের ভয়াবহতা আশা করেনি সরকার’
যন্তর মন্তরের অধিকাংশ আন্দোলনকারীই নরেন্দ্র মোদির শাসনামলেই বড় হয়েছেন। উন্নত ভারত, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও নতুন জাতীয়তাবাদের প্রতিশ্রুতি তাদের বেড়ে ওঠার অংশ ছিল । কিন্তু তাদের অভিযোগ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যক্তিগত কর্মসংস্থান বা ভবিষ্যতের নিরাপত্তায় প্রতিফলিত হয়নি। ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের সংখ্যা ৩৬ কোটিরও বেশি। কিন্তু সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ২৫ বছরের কম বয়সি স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশই বর্তমানে বেকার।
মে মাসে সরকার স্বীকার করে যে, মেডিক্যাল ও ডেন্টাল প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হবে। এরপরই দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়।
এই পরিস্থিতিতে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অভিজিৎ দিপকের তৈরি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন উদ্যোগ ককরোচ জনতা পার্টি দ্রুত যুবসমাজের ক্ষোভের মুখপাত্র হয়ে ওঠে। পরীক্ষা দুর্নীতির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও সামাজিক অগ্রগতির অভাবও আন্দোলনের কেন্দ্রে চলে আসে।
দিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাহুল ভার্মার মতে, এটি বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা। সমাজে যে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছিল, তার গভীরতা সরকার হয়ত কখনও বুঝতেই পারেনি।' তাঁর মতে আগের আন্দোলনগুলি মূলত নীতিগত ও আদর্শগত বিরোধকে কেন্দ্র করে ছিল। কিন্তু সিজেপির আন্দোলন প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে। তাই সেটিকে মোকাবিলা করা সরকারের পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্দোলনের হাতিয়ার সোশ্যাল মিডিয়া
শুরুতে সরকার ছাত্রদের এই আন্দোলনকে গুরুত্ব দেয়নি। গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে ধর্মেন্দ্র প্রধান সিজেপিকে জঙ্গি সংগঠনের বি টিম বলেও আখ্যা দেন। প্রধান ধারার কোন সংবাদমাধ্যমে পর্যাপ্ত কভারেজ না পাওয়ায় আন্দোলনকারীরাই সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করেন। ইনস্টাগ্রাম রিল, ভিডিও, মিম, ফেসবুক লাইভ আপডেট,এক্স একাউন্ট সবকিছুর মাধ্যমে আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্ত দেশজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায়। বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ দ্রুত জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
২০ জুলাই সংসদ অভিযানে পুলিশ ছাত্রদের উপর নির্মমভাবে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করলে আন্দোলন আরও গতি পায়। এরপর শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধান নয়, কিছু বিক্ষোভকারী সরাসরি নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও তুলতে শুরু করেন । ২০২৪ সালে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরলেও বিজেপির লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্কের অসন্তোষকে উপেক্ষা করা এখন সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাহুল ভার্মার মতে , এই আন্দোলনের বড় অংশই ছিল মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণ-তরুণী এবং তাঁদের অভিভাবকরা। যাঁরা এতদিন বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাই এই আন্দোলন সরকারের কাছে বিশেষভাবে চাপের হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি বদলাতে গত সপ্তাহে নরেন্দ্র মোদি সোশ্যাল মিডিয়ায় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দুটি সেলফি ভিডিও প্রকাশ করেন। প্রথম ভিডিওটি নিয়ে ব্যাপক ব্যঙ্গ হওয়ার পর দ্বিতীয় ভিডিওতে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলও বদলান তিনি। সেখানে তিনি বলেন, বন্ধুরা, ধন্যবাদ। তোমাদের পরামর্শ এবং ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
এরপরের ধাপ কী?
শনিবার আন্দোলনের নেতারা জানান যে, মোদি সরকার তাদের বাকি দাবিগুলিও বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে। এর মধ্যে প্রশ্নফাঁসের জেরে আত্মহত্যা করা ছাত্রছাত্রীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবিও রয়েছে। এরপরই আন্দোলন সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয় এবং যন্তর মন্তরের মূল বিক্ষোভস্থল খালি করে দেওয়া হয়।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে সিজেপি এমন এক নজির তৈরি করেছে, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও অনেকের কাছে অকল্পনীয় ছিল। এখন দেখার বিষয়, এই সাফল্যকে ভিত্তি করে ভারতের জেন-জি প্রজন্ম ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে কি না। অবশ্য নরেন্দ্র মোদি এখনও দেশের অন্যতম নেতা এবং বিজেপিও শক্তিশালী নির্বাচনী যন্ত্র।
কয়েকমাস আগেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের নির্বাচনে দলটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনও ২০২৯ সালের আগে নয়। বিজ্ঞাপন সংস্থায় কর্মরত আন্দোলনকারী দেবাংশ গুপ্ত বলেন, এটি শেষ পর্যন্ত যুবসমাজের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। বহু বছর পর তরুণদের সমস্ত সমস্যার কথা একসঙ্গে সরকারের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। ভারতের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। অন্যদিকে, যন্তর মন্তর ছাড়ার আগে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে স্পষ্ট বার্তা দেন, এটাই শেষ নয়। খুব শিগগিরই আবার দেখা হবে।




