প্রার্থনায় বাধা, মারধর ও ‘শুদ্ধিকরণ’
পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

প্রতীকী ছবি
পশ্চিমবঙ্গে পরপর দুই জেলায় খ্রিস্টান পরিবারকে ঘিরে হামলা, হেনস্তা ও জোর করে ধর্মীয় আচার পালনে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার এ দুই ঘটনায় আক্রান্তরা দাবি করেন, খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে হিন্দুধর্ম গ্রহণে রাজি না হওয়ায় তাদের নিশানা করা হয়েছে। অভিযোগ ঘিরে পুলিশের ভূমিকা এবং সংখ্যালঘুদের ধর্মাচরণের অধিকার নিয়েও এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠছে।
পাঁশকুড়ার পশ্চিম অর্জুনদা গ্রামের বাসিন্দা পার্বতী হেমব্রম সোরেনের অভিযোগ, গত ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে প্রার্থনা করার সময় প্রায় ৩০ জনের একটি দল তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। জানা যায়, সে সময় অভিযুক্তদের কয়েকজন নিজেদের বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, তাকে চড়, ঘুসি ও লাথি মারা হয়, চুলের মুঠি ধরে টেনে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তার ননদকেও মারধর করা হয়। বাড়িতে থাকা চারটি বাইবেল নষ্ট করে পাশের পুকুরে ফেলে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে না দিলে প্রাণে মারার পাশাপাশি সামাজিক ও আর্থিক বয়কটের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এর আগে ১১ অক্টোবরও একই ধরনের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন পার্বতী। এ পরিস্থিতিতে ২৮ অক্টোবর পাঁশকুড়া থানায় এফআইআর হয়।
এর কয়েক দিন আগে, ১৮ থেকে ২০ অক্টোবর চন্দ্রকোনার পাটলাপুর গ্রামে তিনটি খ্রিস্টান পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ৪০ বছর বয়সী লক্ষ্মী মণ্ডলের দাবি, ১৮ অক্টোবর বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তাকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে মারধর করা হয়। এমনকি পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হয় এবং প্রকাশ্যে পানি ঢেলে ‘শুদ্ধিকরণ’-এর নামে ধর্মীয় আচার পালন করানো হয়। তার ১৬ বছরের মেয়েকে অপহরণ ও ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। এর পরদিন তাদের দুর্গামণ্ডপে নিয়ে গিয়ে প্রার্থনা করানো হয়। এ ঘটনায় ১৩ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে। যদিও ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। গ্রামটিতে পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা।
সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর হিসাবে, ১৩ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজ্যের ১৩টি জেলায় খ্রিস্টানদের নিশানা করে অন্তত ৬০টি ঘটনার নথি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি প্রার্থনাসভা, বাড়ি, গির্জা বা ধর্মীয় জমায়েতে হস্তক্ষেপ এবং আটটি শারীরিক হামলা, গণহিংসা বা সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
অন্যদিকে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা চন্দ্রনাথ দাস। তবে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনার অভিযান তাদের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেছেন, সরকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। অভিযোগকারীরা আইনি পথে আসুন। বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিকের অভিযোগ, ধারাবাহিক ঘটনার পরও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।



