কালো কোটে ফিরলেন মমতা
- বিজেপির বুলডোজারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে লড়াই

সংগৃহীত ছবি
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বরাবরই এক ব্যতিক্রমী চরিত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কখনো রেলমন্ত্রী, কখনো মুখ্যমন্ত্রী। কখনো রাজপথের আন্দোলনের মুখ। আর এবার আইনজীবী। জাঁদরেল উকিল। গতকাল বৃহস্পতিবার তার নতুন এই চরিত্র দেখলেন কলকাতা হাইকোর্ট। লাল-হলুদ গথিক স্থাপত্যের সামনে গতকাল সকালে যে দৃশ্য দেখা গেল, তা শুধু রাজনৈতিক নয়, এক বিরল মুহূর্ত হয়ে থাকবে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসেরও। সাদা ব্যান্ড, কালো কোট, চোখেমুখে চেনা দৃঢ়তা— আইনজীবীর পোশাকে হাইকোর্টে ঢুকলেন বাংলার বাঘিনী; রাজ্যের বিরোধীদলীয় নেত্রী। বহুদিন পরে রাজ্যের মানুষ যেন আবার দেখতে পেলেন সেই পুরনো মমতাকে। যিনি শুধু রাজনীতির মঞ্চে নন, লড়াইয়ের প্রতিটি পরিসরে নিজেকে বারবার হাজির করেছেন নতুনভাবে।
ভোট-পরবর্তী হিংসা, তৃণমূলকর্মীদের ওপর হামলা এবং বিজেপির বুলডোজার অভিযানের অভিযোগ নিয়ে যে মামলা কলকাতা হাইকোর্টে উঠেছে, সেই মামলার শুনানিতেই উপস্থিত হন তিনি। রাজনৈতিক মহলের জল্পনা আরও বেড়ে যায়, যখন জানা যায় তিনি শুধু উপস্থিতই নন, বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে পরিচালনা করবেন মামলাও। আদালত চত্বরে তার প্রবেশ নিছক কোনো আইনি পদক্ষেপ নয়। বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা। ক্ষমতা হারালেও লড়াইয়ের ময়দান ছাড়েননি এই লড়াকু নেত্রী।
কালীঘাটের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন আসলে একটানা সংগ্রামের গল্প, ছক ভাঙার গল্প। শূন্য থেকে শুরু করে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন শুধু জেদ, সাহস আর অসাধারণ জনসংযোগের শক্তিতে। নব্বইয়ের দশকে বাংলার রাজপথে তার আন্দোলন, পুলিশের লাঠি, রক্তাক্ত মিছিল— সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বামফ্রন্টবিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় মুখ। পরে তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটান। বাংলার রাজনীতিতে সেই পরিবর্তনের ইতিহাস আজও অনেকে ‘এক নারীর অসম্ভব লড়াই’ বলেই মনে করেন। অনেকেরই মতে, তাকে দেখেই বাংলার নারীরা রাজনীতিতে পা রাখার অনুপ্রেরণা পান। মমতার রাজনীতি শুধু নির্বাচনের অঙ্ক নয়, আবেগেরও নাম। তাই মুখ্যমন্ত্রীর পদ হারানোর পরও তিনি আলোচনার কেন্দ্রে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি হয়তো আড়ালে চলে যাবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো ছবি। কখনো বিরোধী জোটের ডাক, কখনো আদালতের লড়াই; তিনি যেন নতুন ভূমিকায় নিজেকে ফের গড়ে তুলছেন।
মমতার আইন পড়ার ইতিহাসও নতুন নয়। যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কলকাতার যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী আইন কলেজ থেকে আইনের ওপর ডিগ্রি নেন তিনি। রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে সেই পেশায় নিয়মিত থাকা হয়নি ঠিকই, কিন্তু আদালতের পরিবেশ তার অচেনা নয়। এর আগেও সুপ্রিম কোর্টে নিজের মামলায় সওয়াল করতে দেখা গিয়েছিল তাকে। তাই বৃহস্পতিবারের দৃশ্য অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়ের, আবার অনেকের কাছে ছিল এক প্রত্যাবর্তনের সূচনা।




