কী আছে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যে
মমতার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নাকি বিজেপির হিন্দুত্ব?

সংগৃহীত ছবি
আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। আরও আছে বামফ্রন্টের জোট। একদিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, উল্টোদিকে ঘৃণার হাঁড়ি (কট্টর হিন্দুত্ববাদ)।
কোন পথে হাঁটল পশ্চিমবঙ্গ? ৪ মে ভোট গণনা শেষ হলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে সব।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই অনিশ্চয়তায় ঘেরা। ২০১১ সালে যখন ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় এলো, তখন তা অনেকাংশেই অপ্রত্যাশিত। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে উত্তাপ আবারও বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে তৃণমূল কংগ্রেস কি টানা ক্ষমতায় থাকতে পারবে, নাকি বিজেপি শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠবে? অন্যদিকে বহুদিনের হারানো জমি ফিরে পেতে সক্ষম হবে কি বামরা? বিধানসভা নির্বাচনের সদ্য সমাপ্ত দু-দফার ভোটে (২৩ ও ২৯ এপ্রিল) সেটাই পরিষ্কার হবে এবার।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার অসংখ্য জনমুখী প্রকল্প চালু করেছে এবং সেই প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাবও ফেলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। মেয়েদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং কম বয়সে বিয়ে বন্ধ করায় এই প্রকল্প অনেকটাই কার্যকর। একইভাবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার রাজ্যের নারীদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দিয়ে পরিবারভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। যুবশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, সবুজ সাথীর মতো প্রকল্পও বহু মানুষের কাছে সরকারকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
রাজনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করা যায় না প্রকল্পগুলোর। ভোটের সময় উন্নয়ন বা আদর্শের পাশাপাশি মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা। বিশেষত, নারী ভোটব্যাংকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রভাব। বিস্তর আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলেও। রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে এবং নিম্নবিত্ত পরিবারে এই প্রকল্পগুলোর গ্রহণযোগ্যতা এখনো যথেষ্ট। ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে এটি একটি বড় শক্তি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, এবারের ভোটে ‘বাংলা অস্মিতা’ বা বাঙালি পরিচয়ের প্রশ্নকেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক গর্বকে সামনে রেখে এক ধরনের আবেগঘন রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছে মমতার দল। অতীতেও কার্যকর হয়েছে এই কৌশল।
তবে এ ছবির অন্য দিকও আছে। এবারের নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে ভোটার তালিকা ও পরিচয় যাচাই-সংক্রান্ত বিতর্ক—অর্থাৎ ‘এসআইআর’। এই বিশেষ যাচাই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাব হিসেবে দেখছেন অনেকেই। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, নতুন ভোটার সংযোজন এবং পুরনো নাম বাদ পড়া নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা জোরালো প্রভাব ফেলতে পারে নির্বাচনে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আসছে বিজেপি। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম নিয়ে চলছে একাধিক মামলা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর জি কর ধর্ষণকাণ্ড ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন। বিজেপি এসব ইস্যুকে সামনে এনে জনঅসন্তোষ তৈরির পথ ধরেছিল সরকারের বিরুদ্ধে। তবে বিজেপির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। পশ্চিমবঙ্গে এখনো দলটির সাংগঠনিক ভিত সব জায়গায় সমান শক্তিশালী নয়। গ্রামীণ এলাকায় স্থানীয় নেতৃত্বের অভাব। প্রশ্ন রয়েছে সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্য নিয়েও। রয়েছে উল্টো চিত্রও। বিজেপিশাসিত পাশের রাজ্যগুলোর অব্যবস্থার ছবিও শঙ্কামুক্ত করতে পারছে না মানুষকে। রয়েছে সাম্প্রদায়িক উগ্রতাও; যা অনেকাংশেই গ্রহণযোগ্য নয় রাজ্যবাসীর।
বামপন্থিদের উপস্থিতি এখনো রাজনৈতিক আলোচনায় থাকলেও, বাস্তব নির্বাচনী সমীকরণে তারা বর্তমানে তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটব্যাংকের বড় অংশ হারিয়েছে বামরা। কিছু এলাকায় সীমিত প্রভাব থাকলেও, এবারের নির্বাচনে তাদের ভূমিকা মূলত ভোট কাটার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মত।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু দলগত লড়াই নয়, বরং উন্নয়ন বনাম দুর্নীতি, আঞ্চলিক আবেগ বনাম জাতীয় রাজনীতি এবং সামাজিক সুরক্ষা বনাম প্রশাসনিক প্রশ্নের এক বড় পরীক্ষা। তৃণমূল কংগ্রেসের জনমুখী প্রকল্পগুলো যেমন ভোটে বড় ভূমিকা নিতে পারে, তেমনি প্রভাব ফেলতে পারে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগও। আবার বিজেপির প্রতিশ্রুতি ও ধর্মের রাজনীতি কতটা মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে—সেটাই হবে বড় প্রশ্ন।
এখন চোখ ৪ মে ফলের দিকে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামাজিক সুরক্ষা ও ভাতানির্ভর মডেল। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টির পরিবর্তনের ডাক ও হিন্দুত্ব রাজনীতি। এই দুয়ের সংঘর্ষই এ ভোটের মূল সুর।
গ্রামীণ বাংলায় নারী ভোটারদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস এখনো একটি শক্ত ভিত ধরে রেখেছে। সবসময় বড় শিল্প মানেই এখানে উন্নয়ন নয়; বরং প্রতিদিনের জীবনে পাওয়া সরাসরি সুবিধা। যেমন—রেশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং মাসিক আর্থিক সহায়তা।
নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যু হয়ে উঠেছে এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন। সরকারি হিসাবে প্রায় ৯০ লাখের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঘটনা সামনে এসেছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ভোটাধিকার ফিরে পাননি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো এই বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে একটা বড় অংশ মুসলিম ভোটার। সংখ্যালঘু সমাজে গভীর ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে এ ঘটনা। প্রশ্ন খুব জোরালো, এটি কী শুধুই প্রশাসনিক ত্রুটি, নাকি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার পরিকল্পিত পদক্ষেপ? বিজেপি এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে বলছে, এটি ভোটার তালিকা ‘পরিষ্কার’ করার উদ্যোগ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু বিরোধীদের দাবি, এটি আসলে ধর্মের ভিত্তিতে মেরূকরণের একটি কৌশল, যা শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন রাজ্যেই। ফলে এই নির্বাচনে এক নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে; ভাতা বনাম বঞ্চনা। একদিকে সরকার মানুষের হাতে সরাসরি অর্থ দিচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারই সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক নয় বিজেপিও। কর্মসংস্থানের অভাব, শিল্পের ঘাটতি এবং দুর্নীতির অভিযোগ—এসব ইস্যুতে তারাও প্রভাবিত করতে পেরেছে একাংশকে। বিশেষ করে, শহরাঞ্চল ও তরুণ ভোটারদের।
এই পরিস্থিতিতে ভোটের ফল নির্ভর করছে মূলত দুটি বড় গোষ্ঠীর ওপর। এক গ্রামীণ নারী ভোটার এবং দুই সংখ্যালঘু ভোটার। যদি ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষার প্রভাব বেশি থাকে, তাহলে এগিয়ে যাবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর যদি আগ্রাসী হিন্দুত্ব ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বেশি প্রভাব ফেলে, তাহলে চমক দেখাতেও পারে বিজেপি। ৪ মে-ই জানা যাবে, শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটতে চেয়েছে মানুষ! মমতার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নাকি বিজেপির হিন্দুত্ব?



