সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে বাংলাদেশি বলে ডিপোর্ট করা যায় না: কলকাতা হাইকোর্ট

কলকাতা হাইকোর্ট
শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে বের করে দিতে পারে না রাজ্য সরকার। এমনটাই বৃহস্পতিবার মন্তব্য করেছেন কলকাতা হাইকোর্টের এক বিচারপতি।
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তির আটক ও তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তাবকে চ্যালেঞ্জ করে করা আবেদনের শুনানি করছিলেন। ওই ব্যক্তির আইনজীবী আদালতকে জানান, কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্য থেকে সৃষ্ট সন্দেহের ভিত্তিতে গত ৮ আগস্ট থেকে তাকে আটক রাখা হয়েছে।
ওই ব্যক্তির স্ত্রী আবেদনটি করেছিলেন। তাদের দুজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বিদেশি আঞ্চলিক নিবন্ধন দপ্তরের (এফআরআরও) দেওয়া আদেশ এবং স্বামীর আটকের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন তিনি। তবে স্ত্রীকে আটক করা হয়নি।
বিচারপতি ভট্টাচার্য বলেন, দেশ থেকে বহিষ্কারের আদেশটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিচারপতির ভাষ্য, ‘মনে হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীকে (আটক ব্যক্তি) নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেয়নি।’
কেন ওই ব্যক্তিকে দুই মাস ধরে আটক রাখা হয়েছে এবং তার জাতীয়তা নির্ধারণে কর্তৃপক্ষ কেন ‘স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করেনি, তা জানতে চান বিচারপতি।
আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেছেন, ‘আমার মক্কেল দুই মাসের বেশি সময় ধরে আটক রয়েছেন। কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্য থেকে তৈরি সন্দেহই তার আটকের ভিত্তি।’
শুধু এ ধরনের বক্তব্যের ভিত্তিতে কীভাবে কারও জাতীয়তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায়, তা জানতে চান বিচারপতি ভট্টাচার্য। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে আটক রাখা যায় না বলেও জোর দেন তিনি।
বিচারপতি প্রশ্ন করেন, ‘১৯৭০-এর দশক থেকে কত মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে এসেছে? তাদের সবাইকে কি ফেরত পাঠানো সম্ভব?’
বিষয়টি উপযুক্ত বেঞ্চে শুনানির জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেন তিনি।
গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে বিজেপিশাসিত একাধিক রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা বাংলাভাষী মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করছে। আদালত বা ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ ছাড়াই সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) ব্যবহার করে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার কয়েক দিন পর নতুন সরকার ‘আটক, নাম বাদ, বহিষ্কার’ নীতি ঘোষণা করে। এই নীতির আওতায় পুলিশকে সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ আটক রেখে দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
বহিষ্কৃত চার ভারতীয় নাগরিককে গত জুলাইয়ে আদালতের নির্দেশে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের মধ্যে একজন নারী ও দুই শিশু ছিল। প্রায় এক বছর বাংলাদেশে কাটানোর পর মালদার মহদীপুর স্থলবন্দর দিয়ে তাদের ভারতে ফেরানো হয়।
বিচারপতি ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘তাই কাউকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারকে যথাযথভাবে নথিপত্র যাচাই করতে হবে। কয়েকজনের বক্তব্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনুপ্রবেশকারী বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।’
রাজ্য সরকারের পক্ষে উপস্থিত অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার বলেন, আটক ব্যক্তি জাল নথির ভিত্তিতে ভোটার কার্ড, আধার ও প্যান কার্ডের মতো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে থাকতে পারেন।
নথিপত্র, নাগরিকত্ব ও নির্বাচনী পরিচয় নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের মধ্যে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সামনে এল। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিতর্কিত বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বিজেপিকে সুবিধা দিতে লাখ লাখ প্রকৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নাম বাদ পড়া অনেকেই সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে দেশ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার আশঙ্কায় তাদের অনেককে প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, এসআইআরের পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে বিবেচিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ



