মোদি মন্ত্রে ভাঙছে আঞ্চলিক দল

গত এক দশকে ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো আঞ্চলিক দলগুলোর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়া। একসময় উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি, বিহারে জেডিইউ, আরজেডি, মহারাষ্ট্রে শিবসেনা এবং এনসিপি, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে, ওড়িশায় বিজেডি কিংবা তেলেঙ্গানায় বিআরএস— এ দলগুলোই ছিল নিজ নিজ রাজনীতির প্রধান শক্তি। কিন্তু ২০১৪ সালের পর বিজেপির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বড় অংশই চাপে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি শুধু নির্বাচনী লড়াইয়ের মাধ্যমে নয়, বহুমুখী রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে এই সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ইডি, সিবিআই বা আয়কর দপ্তরের তদন্তের মুখে পড়া বহু নেতা বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছান। যদিও বিজেপি বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আরেকটি বহুল আলোচিত কৌশল হলো ‘অপারেশন লোটাস’। কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গোয়া ও মণিপুরের মতো রাজ্যগুলোয় বিরোধী শিবিরের বিধায়কদের দলত্যাগ, সরকার পতন এবং পরে বিজেপি-সমর্থিত সরকার গঠনের ঘটনাগুলো এই বিতর্ককে আরও জোরদার করেছে। বিরোধীরা অভিযোগ করে, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বিজেপি পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে ক্ষমতায় এসেছে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বিজেপির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। পরিবারতন্ত্র, উত্তরাধিকারভিত্তিক নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন্দ্রীকরণের কারণে বহু আঞ্চলিক দলের ভেতর অসন্তোষ জমা হয়। বিজেপি সেই অসন্তুষ্ট নেতাদের নিজেদের দিকে টেনে এনে দলগুলোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। মহারাষ্ট্রে একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের উত্থান, মধ্যপ্রদেশে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার বিদ্রোহ কিংবা উত্তর-পূর্বে একাধিক দলবদলের ঘটনা এই প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়।
একই সঙ্গে বিজেপির আদর্শগত রাজনীতিও আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দুত্ববাদ এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বার্তা দিয়ে বিজেপি এমন বহু ভোটব্যাংকে প্রবেশ করেছে, যা আগে আঞ্চলিক দলগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর ফলে আঞ্চলিক রাজনীতির পরিসর অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে।
একসময় উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি, বিহারে জেডিইউ, আরজেডি, মহারাষ্ট্রে শিবসেনা এবং এনসিপি, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে, ওড়িশায় বিজেডি কিংবা তেলেঙ্গানায় বিআরএস— এ দলগুলোই ছিল নিজ নিজ রাজনীতির প্রধান শক্তি। কিন্তু ২০১৪ সালের পর বিজেপির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বড় অংশই চাপে পড়েছে
মহারাষ্ট্র থেকেই বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের শুরু বলা যায়। ২০১৪ সালে বিজেপি প্রথমবার রাজ্যের সবচেয়ে বড় দল হয়। তখনো শিবসেনা ছিল বড় হিন্দুত্ববাদী আঞ্চলিক শক্তি। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরে বিজেপি ধীরে ধীরে শিবসেনার রাজনৈতিক জমি দখল করতে শুরু করে। এর পরের ধাপগুলো ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ— ২০২২ সালে শিবসেনা ভেঙে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে বড় অংশ বিজেপির সঙ্গে যায়। ২০২৩ সালে এনসিপিও ভেঙে অজিত পাওয়ারের গোষ্ঠী বিজেপি জোটে যোগ দেয়। ফলে মহারাষ্ট্রকে আজ বিজেপির জন্য আঞ্চলিক দল ভেঙে শক্তি বাড়ানোর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
অরুণাচল প্রদেশকেও (২০১৬) অনেক বিশ্লেষক বিজেপির প্রথম বড় ‘দল-ভাঙন মডেল’ বলে থাকেন। ২০১৬ সালে কংগ্রেসের অধিকাংশ বিধায়ক দলত্যাগ করেন। পরে সেই গোষ্ঠীর বড় অংশ বিজেপিতে যোগ দেয়। একসময় ৪৪ জনের মধ্যে ৪৩ কংগ্রেস বিধায়কই দল ছেড়ে দেন। এর ফলেই বিজেপি দ্রুত রাজ্যের প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালের পরবর্তী সময়ে বিজেপির ক্ষমতা বিস্তার শুধু নির্বাচনী সাফল্য নয়। এটি একদিকে শক্তিশালী সাংগঠনিক বিস্তার, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের ভাঙন, বিজেপির হিন্দুত্ববাদের নীতি, দলবদল, আঞ্চলিক নেতৃত্বকে নিজেদের দিকে টেনে আনা এবং জোট-রাজনীতির সমন্বিত কৌশলের ফল। বিশেষ করে অরুণাচল, গোয়া, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র— এই পাঁচটি রাজ্য বিজেপির সেই কৌশলেরই ফসল। আর সে কারণেই ভারতের রাজনীতিতে আজ প্রশ্ন উঠছে— দেশ কি ধীরে ধীরে একক জাতীয় দলের প্রভাবশালী আধিপত্যের দিকে এগোচ্ছে?




