ভারত
এক চড়েই থেমে গেল ছয় বছরের প্রাণ, তবু স্কুলে বন্ধ হচ্ছে না শাস্তি

শ্রেণিকক্ষের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শিক্ষিকা শিশুটিকে কাছে টেনে চড় মারছেন এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে তার গায়েই লুটিয়ে পড়ছে।
সেদিন সকালেও ছয় বছরের তাম্মানা প্রণয় তেজা জানত না, স্কুলে যাওয়াটাই তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে। গত ২০ আগস্ট সকালে অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের লিটল গার্ডেন স্কুলে গিয়েছিল সে। দুপুরের দিকে খবর যায়, শ্রেণিকক্ষে অসুস্থ হয়ে পড়েছে শিশুটি। পরে তাকে কিং জর্জ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। অভিযোগ, হোমওয়ার্ক শেষ না করায় শিক্ষিকা তাকে শাস্তি দিয়েছিলেন। শ্রেণিকক্ষের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শিক্ষিকা শিশুটিকে কাছে টেনে চড় মারছেন এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে তার গায়েই লুটিয়ে পড়ছে।
প্রণয়ের পরিবার বলছে, স্কুলে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা আগেও ছিল। মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু হওয়ার পর অন্ধ্রপ্রদেশের স্কুল শিক্ষা দফতর তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। প্রথমে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা হলেও তদন্তের পর পুলিশ ২৪ আগস্ট তা সংশোধন করে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৫ ধারা এবং শিশুদের সুরক্ষা আইনের ৭৫ ধারা যুক্ত করে। ২৫ আগস্ট অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে গ্রেফতার করা হয় এবং আদালত তাকে ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠায়।
ছয় বছরের ছোট্ট শিশু প্রণয়ের মৃত্যুতে ফের সামনে এসেছে ভারতের বহু পুরনো প্রশ্ন- স্কুলে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ হওয়ার এক দশকেরও বেশি সময় পরেও কেন তা এতটা স্বাভাবিক? ২০০৯ সালের শিশুদের বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার আইনে স্কুলে শারীরিক শাস্তি ও মানসিক হয়রানি নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৫ সালের কিশোর ন্যায়বিচার আইনেও শিশুদের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিষ্ঠুর আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবু আইন আর শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে। ২০১৮ সালে গুরগাঁওয়ের নিম্নআয়ের পড়ুয়াদের নিয়ে করা এক সমীক্ষায় প্রায় ৮০ শতাংশ জানিয়েছিল, সপ্তাহে একাধিকবার তাদের মারধর করা হয়। আর এই শাস্তির বোঝা সবার উপর সমানভাবে পড়ে না। গবেষক ও অধিকারকর্মীদের বক্তব্য যে, দলিত সম্প্রদায়, আদিবাসী এবং মুসলিম পড়ুয়ারা অনেক সময় জাতপাত ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেও বেশি বৈষম্যের শিকার হন। ২০২২ সালের একটি গবেষণাতেও দেখা যায়, শারীরিক শাস্তির নেতিবাচক প্রভাব সুবিধাবঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের ক্ষেত্রে আরও তীব্র হতে পারে।
২০২২ সালে রাজস্থানে দলিত ছাত্র ইন্দর মেঘওয়ালের মৃত্যুর ঘটনাও সেই প্রশ্ন তুলেছিল। শিক্ষকের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট জলের পাত্র ছোঁয়ার অভিযোগে তাকে মারধর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালে উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগরে সাত বছরের মুসলিম ছাত্র মোহাম্মদ আলতামাশকে গোটা শ্রেণিকে দিয়ে চড় মারানোর ঘটনাও দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। বিশাখাপত্তনমে তদন্ত চলছে। শিক্ষকদের আরও সংবেদনশীল ও মানবিক হওয়ার প্রশিক্ষণের কথাও বলছে প্রশাসন। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে- শিশুকে মানুষ করার নামে যদি ভয় দেখানোই শিক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে সেই শ্রেণিকক্ষ আদৌ কতটা নিরাপদ?







