বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট
কোন জাদুতে দারিদ্র্যমুক্ত হলো ভারতের ৫০ কোটি মানুষ

ছবি: রয়টার্স
ভারত। আয়তন ও জনসংখ্যা, উভয়েই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ। উৎসব-বিক্ষোভ, কোন্দল-বৈষম্যে ঠাসা এক জনপদ। অথচ দেশটির ৫০ কোটি মানুষ এখন দারিদ্র্যমুক্ত ! গত অক্টোবরে প্রকাশিতে এক প্রতিবেদনে খোদ বিশ্বব্যাংকের মুখেই উঠে এসেছে সে কথা। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে ১২ বছরে দারিদ্র্য ২৭.১ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ২.৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের 'ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬' অনুযায়ী, ভারতে অসমতার মাত্রা বিশ্বের সর্বোচ্চগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভারতের দারিদ্র্যবিমোচনের ইতিবাচক এই পরিবর্তন নিয়ে মঙ্গলবার আরেকটি বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছে আলজাজিরা। এর আগে এই একই জাদুতে (২০২২ সালে ) চীনের প্রায় ৮০ কোটিরও বেশি মানুষ মুক্তি পায় দরিদ্রতার অভিশাপ থেকে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্য যা বলে
বিভিন্ন দেশের দারিদ্র্যের হার হিসাবে বিশ্বব্যাংক বিবেচনা করে একটি মানদণ্ড। সেটিতে দৈনিক আয় ধরা হয় ৩ ডলার। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মানদণ্ডটি বিবেচনায় নিলে, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার ২৭.১ শতাংশ থেকে কমে নেমে এসেছে ২.৬ শতাংশে। উল্লেখ্য, চরম দারিদ্র্য বলতে বোঝায়— খাদ্য, পানি, বাসস্থান ও পোশাকের মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর জন্য ন্যূনতম অর্থের অভাব।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তিনটি সরকারি জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্যের পরিমাপকগুলো বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, প্রায় ৪৯ কোটি ৬০ লাখ মানুষ বেরিয়ে এসেছে দারিদ্র্য থেকে। এর কারণ, ভারতের মোট জনসংখ্যার মধ্যে যারা দৈনিক ৪.২ ডলারের (নিম্ন-মধ্যম আয়ের দারিদ্র্যসীমা) নিচে বসবাস করত, তাদের হার ৫৭.৭ শতাংশ থেকে কমে ১৬.১ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের এই রিপোর্টটির নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির দক্ষিণ এশীয় দারিদ্র্যবিষয়ক অর্থনীতিবিদ আয়াগো ওয়ামবিল। প্রতিবেদনে তারা লিখেছেন, ভারতে দারিদ্র্য হ্রাসের ধারা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও এই গতি কিছুটা ধীর হতে পারে। তাদের অনুমান অনুযায়ী, দৈনিক ৪.২০ ডলার আয়ের সীমানায় থাকা দারিদ্র্যের হার ২০২৬ সালের ১৪.২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৮ সাল নাগাদ ১২.১ শতাংশে নেমে আসবে। তারা আরও উল্লেখ করেছেন, 'এই অগ্রগতির মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এবং খাদ্য ভর্তুকিসহ সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ।'
ভারতের দারিদ্র্য কমানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ
ভারতে ১২ বছরে প্রায় ৫০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার বিষয়টিকে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি আরও বলেছে, দারিদ্র্য হ্রাসের এই ধারাটি ‘বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম দারিদ্র্য হ্রাসের ঘটনা’। গত রবিবার ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দারিদ্র্য মোকাবিলায় ভারতের অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'দারিদ্র্যের হার কমেছে ঐতিহাসিক মাত্রায়। তৈরি হয়েছে প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ।'
ভারতের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পরিকল্পনা কমিশনের উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ এবং বর্তমানে মস্কোর 'হায়ার স্কুল অব ইকোনমিক্স'-এর ভিজিটিং প্রফেসর সন্তোষ মেহরোত্রা। তিনি উল্লেখ করেছেন জি-২০ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতই একমাত্র নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ, যেখানে অন্য সদস্য দেশগুলো উচ্চ-মধ্যম বা উচ্চ আয়ের অন্তর্ভুক্ত। আলজাজিরাকে তিনি বলেছেন, 'বিশাল জনসংখ্যার কারণে আমাদের দেশে দরিদ্র মানুষের প্রকৃত সংখ্যা এখনো বিশ্বে সর্বোচ্চ। তাই আমরা যদি সত্যিই দারিদ্র্যের হার কমাতে পারি এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে দরিদ্র মানুষের মোট সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি, তবে তা বিশ্ব জুড়ে এক বড় প্রভাব ফেলবে।'
ভারতের দারিদ্র্য হ্রাসের পেছনে কোন জাদু?
আলজাজিরার প্রতিবেদন বলছে, এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। তবে অর্থনীতিবিদরা এমন কিছু কারণ ও কর্মসূচির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা ভারতকে রেকর্ডসংখ্যক মানুষকে দারিদ্র্যসীমার বাইরে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সফল হতে সাহায্য করেছে বলে মনে করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে ভারত তার অর্থনীতি উন্মুক্ত করার পর থেকেই দেশটিতে কমতে শুরু করে দারিদ্র্য। সেসময় দেশটিতে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস দল। এটি পরবর্তী তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করেছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো এমন অনেক সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা দারিদ্র্য মোকাবিলায় সহায়তা করেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। উদাহরণস্বরূপ, প্রধানমন্ত্রী মোদির পূর্বসূরি মনমোহন সিং একটি কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু করেছিলেন, যার আওতায় গ্রামীণ এলাকায় বছরে অন্তত ১০০ দিন কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া হতো।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চালু করেছেন দারিদ্র্য মোকাবিলায় সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান, বিনামূল্যে রেশন ও আবাসনসহ আরও বেশ কিছু কল্যাণমূলক কর্মসূচি। মোদির শাসনামলে সরকার গ্রামীণ ভারতে শৌচাগার নির্মাণের কাজ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে গ্রামীণ পরিবারগুলোর মধ্যে ১৭ শতাংশেরও কম বাড়িতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানীয় জলের সুবিধা ছিল, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮২ শতাংশে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জন্য ভারতের দারিদ্র্যবিমোচন প্রচেষ্টার ওপর লেখা একটি গবেষণাপত্রে অর্থনীতিবিদ ভাল্লা এবং করণ ভাসিন উল্লেখ করেছেন, 'নিরাপদ পানি পাওয়ার ফলে অসুস্থতা কমেছে, যা পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকতে পারে।'
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের আগে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক কর্মকর্তা ভাল্লা এবং ভাসিন ভারতের অর্থব্যয়-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, দেশটি চরম দারিদ্র্য দূর করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করছে।



