টেসলার ‘উড়ন্ত গাড়ি’ রোডস্টার: কত উঁচুতে উড়বে, দামই বা কত?

সংগৃহীত ছবি
রকেটের মতো থ্রাস্টার, মাঝ আকাশে ডিগবাজি, আবার চাকার ওপর অবতরণ—টেসলার নতুন রোডস্টারের প্রদর্শনীতে যেন বাস্তব হয়ে উঠল উড়ন্ত গাড়ির স্বপ্ন। তবে আকাশে ওঠার এই চমক কতটা বাস্তব আর কতটা প্রদর্শনী, তা নিয়ে প্রশ্নও আছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গাড়িটির উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য ২০২৮ সাল।
ইলন মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক অনুষ্ঠানে নতুন নকশার স্পোর্টস কারটি উন্মোচন করে। গাড়িটি তৈরি করা হয়েছে মাস্কের রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের সঙ্গে যৌথভাবে।
প্রদর্শনীতে দেখা যায়, দুই আসনের রোডস্টারটি বিশেষ সাকশন ব্যবস্থার সাহায্যে একটি র্যাম্পের ওপর উল্টো হয়ে চলেছে। এরপর সেটি মাটি ছেড়ে মাঝ আকাশে ঘুরে আবার অবতরণ করে। অন্য টেসলা গাড়ির ওপর দিয়ে লাফ দেওয়ার কসরতও দেখানো হয়। তবে এই প্রদর্শনী থেকে প্রমাণ হয় না যে রোডস্টারটি বিমানের মতো উড়তে পারে কিংবা প্রচলিত অর্থে উড়ন্ত গাড়ি হিসেবে কাজ করতে পারে।
চমকপ্রদ প্রদর্শনীর পরও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। গাড়িটি সর্বোচ্চ কত উচ্চতায় উঠতে পারে, আকাশে কত দূর যেতে পারে, উৎপাদনের সময় এর চূড়ান্ত বৈশিষ্ট্য কী হবে এবং দাম কত—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।
কত উঁচুতে উঠেছে, কত দূর উড়েছে রোডস্টার?
প্রদর্শনীতে রোডস্টারটি সর্বোচ্চ কত উচ্চতায় উঠেছে বা আকাশে কত দূরত্ব অতিক্রম করেছে, তা টেসলা প্রকাশ করেনি। ভিডিওতে গাড়িটিকে অল্প সময়ের জন্য মাটি ছেড়ে উঠতে, মাঝ আকাশে ঘুরতে এবং আবার মাটিতে ফিরতে দেখা গেছে। অন্য গাড়ির ওপর দিয়ে লাফ দেওয়ার সময়ও এটি থ্রাস্টার ব্যবহার করেছে।
প্রদর্শনীতে প্রোটোটাইপটির স্বল্প সময়ের আকাশে ওঠা ও কসরত করার সক্ষমতা দেখা গেছে। তবে দীর্ঘ দূরত্ব ধরে উড়তে পারার প্রমাণ মেলেনি।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গাড়ি অল্প সময়ের জন্য মাটি ছেড়ে উঠতে পারলেই সেটি দৈনন্দিন যাতায়াতের উড়ন্ত গাড়ি হয়ে যায় না। দীর্ঘ সময় উড়তে হলে এর উত্তোলনক্ষমতা, স্থিতিশীলতা, উড়তে পারার সময়সীমা, জ্বালানি বা শক্তি খরচ, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন। এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য টেসলা প্রকাশ করেনি।
প্রদর্শনীর ভিডিও শেয়ার করে টেসলা লিখেছে, ‘বাস্তব জীবন, বেবি।’ মাস্কও বলেছেন, ‘দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সত্যিই উড়ন্ত গাড়ি থাকবে।’
টেসলার উড়ন্ত রোডস্টার কীভাবে কাজ করে?
রোডস্টারে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তির সঙ্গে স্পেসএক্সের সহযোগিতায় তৈরি একটি ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে দুটি প্রধান প্রযুক্তি দেখানো হয়। বিশেষভাবে তৈরি র্যাম্পে গাড়িটিকে উল্টো হয়ে চলতে সাহায্য করে সাকশন ব্যবস্থা। আর ঠান্ডা গ্যাসের থ্রাস্টার গাড়িটিকে মাটি ছেড়ে উঠতে, ঘুরতে এবং স্বল্প সময়ের আকাশপথের কসরতের সময় স্থিতিশীল থাকতে সহায়তা করে।টেসলার ভাষ্য, সাকশন ব্যবস্থাটি একাধিক মোডে কাজ করা ফ্যান ও মাটির সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখার ব্যবস্থার সমন্বয়ে তৈরি। এটি গাড়ির নিচ থেকে বাতাস টেনে নিয়ে এমন চাপ সৃষ্টি করে, যাতে গাড়িটি উল্টো অবস্থাতেও কোনো পৃষ্ঠের সঙ্গে আটকে থাকতে পারে। গাড়িটির নকশায় সক্রিয় অ্যারোডাইনামিকস ও সমন্বয়যোগ্য সাসপেনশনও রয়েছে।
ঠান্ডা গ্যাসের থ্রাস্টার চাপযুক্ত গ্যাস ব্যবহার করে ধাক্কা বা বল তৈরি করে। অ্যাকচুয়েটরের মাধ্যমে এগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রচলিত গাড়ি যেখানে গতি বাড়ানো ও বাঁক নেওয়ার জন্য টায়ারের গ্রিপের ওপর নির্ভর করে, সেখানে থ্রাস্টারযুক্ত এই সংস্করণ বিশেষ কসরতের জন্য অতিরিক্ত বল তৈরির উদ্দেশ্যে নকশা করা হয়েছে।
টেসলা এক্সে লিখেছে, ‘আজকের রাস্তায় চলা প্রতিটি গাড়ি একটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ: টায়ারের গ্রিপ। রোডস্টারের থ্রাস্টার ব্যবস্থা টায়ারের তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি বল তৈরি করে। একই ভরের ওপর বেশি বল মানে উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো ত্বরণ—বাকি কাজটা পদার্থবিজ্ঞানই করে।’
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, ‘রোডস্টার সত্যিকারের চালকের গাড়ি: এতে রয়েছে সক্রিয় অ্যারোডাইনামিকস, বহু-মোডের সাকশন ব্যবস্থা ও ঠান্ডা গ্যাসের থ্রাস্টার।’
এসবই কোম্পানির দাবি। প্রকাশ্যে পাওয়া স্বাধীন পারফরম্যান্স পরীক্ষায় এগুলো যাচাই করা হয়নি। স্বাভাবিক সড়ক পরিস্থিতি বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করবে, তাও প্রদর্শনীতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
রোডস্টারের সর্বোচ্চ গতি ও ত্বরণ কত?
রোডস্টার নিয়ে টেসলার প্রধান দাবি, গাড়িটি স্থির অবস্থা থেকে ঘণ্টায় প্রায় ৯৭ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে এক সেকেন্ডেরও কম সময় নেবে। প্রতিষ্ঠানটির আরও দাবি, গাড়িটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩৭০ কিলোমিটারের বেশি হতে পারে।
উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। তবে উৎপাদিত গাড়ির স্বাধীনভাবে যাচাই করা পারফরম্যান্স হিসেবে এগুলোকে ধরা উচিত নয়।
দাবি অনুযায়ী ত্বরণ অর্জন করতে পারলে রোডস্টার অত্যন্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গাড়িগুলোর একটি হবে। তবে সড়কে এর পারফরম্যান্স আর আকাশে ওঠার সক্ষমতা আলাদা বিষয়। থ্রাস্টার ব্যবস্থাটি ত্বরণ কতটা বাড়ায়, কতবার ব্যবহার করা যাবে এবং গাড়ির চলার দূরত্বে কী প্রভাব ফেলবে—এসব বিষয়ে টেসলা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য দেয়নি।
উড়ন্ত রোডস্টারের দাম কত?
নতুন নকশার রোডস্টারের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য টেসলা এখনো ঘোষণা করেনি। ২০১৭ সালে দ্বিতীয় প্রজন্মের গাড়িটি প্রথম উন্মোচনের সময় প্রতিষ্ঠানটি এর প্রারম্ভিক দাম ২ লাখ ডলার বলেছিল। তবে নতুন সংস্করণের জন্য সেই দাম নিশ্চিত করা হয়নি।
উন্মোচনের পর টেসলার বুকিং পৃষ্ঠায় বিভিন্ন সংস্করণের জন্য আলাদা অগ্রিম জমার অঙ্ক দেখানো হয়েছে:
- পারফরম্যান্স: বুকিংয়ের জন্য ৫০ হাজার ডলার জমা।
- থ্রাস্ট: ত্বরণে সহায়তাকারী থ্রাস্টারযুক্ত সংস্করণের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার জমা।
- রকেট: সম্পূর্ণ উড্ডয়নব্যবস্থা রয়েছে বলে বর্ণনা করা বিশেষ সংস্করণ।
এসব অঙ্ক বুকিংয়ের অগ্রিম অর্থ, চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য নয়। রকেট সংস্করণটি এক আসনের; অন্য সংস্করণগুলোর বৈশিষ্ট্য আলাদা। দ্য ইনফরমেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্পূর্ণ উড্ডয়নব্যবস্থাযুক্ত সংস্করণটি জনসাধারণের সড়কে চলাচলের অনুমোদন পায়নি।
কবে উৎপাদন শুরু হবে?
নতুন রোডস্টারের উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে টেসলা। ২০১৭ সালে গাড়িটি প্রথম উন্মোচনের পর বহুবার উৎপাদনের সময় পিছিয়েছে। প্রথমে ২০২০ সালে গাড়ি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তৈরি মূল রোডস্টার ছিল টেসলার প্রথম বৈদ্যুতিক গাড়ি। এটি লোটাস এলিসের চ্যাসিস ব্যবহার করে তৈরি হয়েছিল। নতুন মডেলটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ফ্ল্যাগশিপ গাড়ি হিসেবে তৈরি হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্বয়ংচালিত গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিকসের দিকে টেসলার মনোযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৌশল সক্ষমতাও তুলে ধরতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।উড়ন্ত রোডস্টার কি সাধারণ সড়কে চালানো যাবে?
প্রদর্শনী থেকে বোঝা যায় না যে রোডস্টারের আকাশে ওঠার ব্যবস্থা অবাধে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। গাড়িটির বিভিন্ন সংস্করণের সক্ষমতা আলাদা। সম্পূর্ণ উড্ডয়নব্যবস্থাযুক্ত রকেট সংস্করণটি জনসাধারণের সড়কে চলাচলের অনুমোদন পায়নি বলে জানানো হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, নিরাপত্তার মান এবং মাটি ছেড়ে উঠতে পারে এমন গাড়ি চালানোর বাস্তব শর্ত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো বাকি। থ্রাস্টার ব্যবহার করে মাটি ছেড়ে ওঠা বা মাঝ আকাশে ঘোরার মতো কাজ নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে করা যায় কি না, তা প্রমাণ করতে হবে। বিশেষ করে পথচারী, অন্য গাড়ি ও ভবনের আশপাশে এসব কসরত কতটা নিরাপদ, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গাড়ির যাত্রীদের ওপর এই ব্যবস্থা কী প্রভাব ফেলবে, যান্ত্রিক বা প্রপালশন ব্যবস্থায় ত্রুটি হলে গাড়িটি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে এবং কোথায় আকাশপথের কসরত আইনত করা যাবে—এসব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রোডস্টারকে প্রচলিত উড়ন্ত গাড়ি হিসেবে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি টেসলা।
ইউরোপীয় নেতাদের অনলাইনে ‘হয়রানি’ করছেন মাস্ক, অভিযোগ ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী
১৪ অক্টোবর ২০২৬
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া







