যুক্তরাজ্য থেকে মার্কিন বোমারু বিমান সরানো ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব ফেলবে

বি-১ বোমারু বিমান— রয়টার্স
যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ডে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) ঘাঁটির আশপাশে গত সপ্তাহে ব্রিটিশ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী একটি রোবট টহল দেয়। হামলার আশঙ্কা আসন্ন মনে হওয়ায় ৮৫টি বাড়ির বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
এর কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সেখানে মোতায়েন থাকা বি-১ বোমারু বিমানগুলো দেশে ফিরিয়ে নেয়। চলমান ইরান যুদ্ধে এসব বিমান ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছিল। ওই বিমানঘাঁটিতে প্রায় এক ডজন বি-১ মোতায়েন ছিল।
হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ হওয়ার ঘটনায় কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি এবং পাঁচ সন্দেহভাজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিকত্বের এক সন্দেহভাজনকেও ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে আরও সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র তার বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ঘাঁটিতে হামলার কথিত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছে তেহরান।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধের সময় আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ছিল মার্কিন বোমারু বিমানগুলোর একটি বিরতির স্থান। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঘাঁটি থেকে ওয়াশিংটন দ্রুত ইরানে ব্যাপক হামলা চালাতে পারত।
তারা বলেন, বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ায় দ্রুত বোমা হামলার অভিযান পরিচালনা ও তা অব্যাহত রাখার সক্ষমতা ওয়াশিংটনের কিছুটা কমেছে। তবে এর ফলে ইরানে হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধ হয়ে যাবে না।
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক দানিয়া থাফের আলজাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি সুবিধাজনক হামলার ঘাঁটি হারিয়েছে, তাদের মূল হামলা চালানোর সক্ষমতা নয়।’
দীর্ঘমেয়াদি বোমা হামলা আরও কঠিন
বিশ্লেষকেরা একমত যে ব্রিটিশ এই ঘাঁটি ইরানে হামলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আরও দ্রুত ও কার্যকর একটি ব্যবস্থা দিয়েছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক থিংকট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ক্রিস্টফ বার্গস বলেন, ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে থাকা বোমারু বিমানগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিরক্ষামূলক হামলার জন্য সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল—যুক্তরাজ্য সরকারের অনুরোধে। এসব বিমানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকাও সীমিত ছিল।
বার্গস আলজাজিরাকে বলেন, ‘তাদের সরিয়ে নেওয়ায় দ্রুত ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলার সংখ্যা বাড়ানোর সক্ষমতা কমবে। ফলে হুমকির মাত্রাও কিছুটা কমবে।’
থাফের ব্যাখ্যা, বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ায় ইরানে হামলা চালানো বা সংঘাত বাড়ানোর সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তবে ‘অন্য সামরিক সম্পদগুলো কোথায় মোতায়েন রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি বোমা হামলা চালানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে’।
বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ায় বেশ কিছু কৌশলগত ক্ষতির মুখে পড়তে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে বলে মনে করেন অরুণ ডসন। তিনি কিংস কলেজ লন্ডনের ফ্রিম্যান এয়ার অ্যান্ড স্পেস ইনস্টিটিউটের পিএইচডি গবেষক এবং ইউকে নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স নেটওয়ার্কের গবেষক।
আরও আধুনিক বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমানের মতো নয়—শত্রুর নজরদারি এড়ানোই যার নকশার অন্যতম লক্ষ্য এবং যেটি আগেও আরএএফ ফেয়ারফোর্ডে মোতায়েন ছিল। ডসন আল জাজিরাকে বলেন, ‘বি-১-এর প্রধান সুবিধা হলো এর প্রচলিত অস্ত্র বহনের সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অন্য যেকোনো বিমানের তুলনায় এর অস্ত্র বহনের সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, বি-১ অন্তত ৩৪ টন অস্ত্র বহন করতে পারে।
ডসন বলেন, ‘এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি বিমান অভিযানে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে বিপুল পরিমাণ নির্ভুল-নির্দেশিত অস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষেত্রে বি-১ বিশেষভাবে কার্যকর।’
তিনি আরও বললেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে থাকতে পারে বিমান প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের (আইআরজিসি) স্থাপনা।’
বি-১গুলো সরিয়ে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রকে এখন হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দূরবর্তী ঘাঁটি থেকে আরও দীর্ঘপাল্লার মিশনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে উড্ডয়ন সময় ও ক্রুদের ক্লান্তি বাড়বে এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজনও বাড়বে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।
তবে ডসন বলেন, ঝুঁকি পর্যালোচনা করেই হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘তাদের আকস্মিকভাবে চলে যাওয়ার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বিমানগুলো, সেগুলোর ক্রু অথবা ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট কোনো হুমকি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।’
ডসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভবিষ্যৎ অভিযানের জন্য বোমারু বিমানগুলোকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করেছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন যদি মনে করে, অদূর ভবিষ্যতে ইরান যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
থেয়ার মার্শাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা ডেভিড দেস রোশেসের মতে, বি-১ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিতে বিমানগুলো রাখার সুবিধার তুলনায় ঝুঁকিই বেশি ছিল।
গত সপ্তাহের নিরাপত্তা ঘটনাটি ‘একটি দুর্বলতা প্রকাশ করেছে’ বলে তিনি মন্তব্য করেন। কারণ বিমানগুলো ‘খোলা জায়গায়’ ছিল এবং জনসাধারণ যেখান থেকে সেগুলো দেখতে পারত, সেখান থেকে মাত্র প্রায় ৩০০ গজ দূরে ছিল।
তিনি আলজাজিরাকে বললেন, ‘তাই এগুলো ড্রোন হামলা বা অন্য ধরনের মর্টার হামলার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।’
দেস রোশেস বলেছেন, ‘বিস্ফোরক বহনকারী ছোট একটি ড্রোন বা যেকোনো ধরনের ড্রোনও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে পারে।’
সাবেক এই পেন্টাগন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন না থাকায় ‘কিছুটা সামরিক সক্ষমতা হারাতে হবে’। তবে ফেয়ারফোর্ডে দেখা হুমকির কথা উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘বিশ্বজুড়ে আমাদের সব বিমানের ওপর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল বহু বছর আগেই।’
বোমারু বিমানগুলো কি অন্যত্র যেতে পারে?
বোমারু বিমানগুলো অন্যত্র মোতায়েন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি সম্ভাব্য বিকল্প রয়েছে। একটি হলো মধ্য ভারত মহাসাগরের প্রত্যন্ত প্রবালদ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়া। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য—দুই দেশেরই সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। অন্যটি হলো উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটি।
থাফের বলেছেন, সম্ভাব্য ইরানি হামলা থেকে ডিয়েগো গার্সিয়া বেশি সুরক্ষা দিতে পারে। তবে সেখান থেকে ইরানে যেতে বিমানগুলোকে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে।
বার্গস বলেন, ডিয়েগো গার্সিয়ায় বোমারু বিমান পাঠানোর বিষয়টি নির্ভর করবে স্থানীয় ঘাঁটির অবকাঠামোর সঙ্গে দ্রুত অতিরিক্ত বিমান যুক্ত করা কতটা সম্ভব, তার ওপর।
ডসন জানান, ইরানের কাছাকাছি উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমানগুলো মোতায়েন করলে উড্ডয়নের দূরত্ব কমবে, আকাশে জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন কমবে এবং আরও দ্রুত বিমান হামলার মিশন পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
তবে বিশ্লেষকেরা একমত যে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমান মোতায়েন করতে হলে ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে আরও সতর্ক ও বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে। কারণ পুরো যুদ্ধজুড়ে এসব দেশই ইরানের পাল্টা হামলার সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখা দিতে চায় না।
থাফেরের মতে, এ কারণে ফেয়ারফোর্ড ওই দুই বিকল্পের মধ্যে ‘কার্যকর’ একটি মধ্যবর্তী অবস্থান দিয়েছিল।
তবে ফেয়ারফোর্ড এখন আর বিকল্প না থাকায় ডিয়েগো গার্সিয়াই বেশি স্বাভাবিক পছন্দ বলে মনে করেন ডসন। তার মতে, এটি শুধু ইরান থেকে বেশি দূরে নয়, বরং সেখানে আরও নিরাপদে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব। বড় পরিসরে মার্কিন বিমান অভিযান পরিচালনার উপযোগী অবকাঠামোও সেখানে রয়েছে।সামনে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা
এই মুহূর্তে বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার ফলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার বদলে কিছুটা কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
তবে মার্কিন সামরিক বিকল্পগুলোর ওপর এর বাস্তব প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে প্রশাসন এখনই এ ধরনের হামলার প্রয়োজন দেখছে কি না। অথবা ডিয়েগো গার্সিয়ায় একই ধরনের বিমান মোতায়েনের হুমকি আপাতত যথেষ্ট কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে বার্গস মনে করেন।
এদিকে নভেম্বরে থিওডোর রুজভেল্ট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এবং মাকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ফোর্স মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ডসন বলেন, এতে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি থেকে পরিচালিত বিমান শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তিনি বললেন, ‘বিমান দিয়ে বিমান তুলনা করলে, ক্যারিয়ারের যুদ্ধবিমানগুলো বি-১-এর বিপুল অস্ত্র বহনের সক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না। তবে এগুলোর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে কম দূরত্বের হামলা চালানোর ক্ষেত্রে কমান্ডারদের হাতে আরও বেশি বিকল্প থাকবে।’
গবেষক ডসন বলেন, এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের জোটব্যবস্থা এবং বিদেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের গুরুত্ব এবং এসব ব্যবস্থার দুর্বলতাও তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে সামরিক স্থাপনাগুলোর একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। দ্রুত ও বড় পরিসরে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতার জন্য এই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এসব ঘাঁটি হামলা বা রাজনৈতিক বিধিনিষেধের মুখে পড়লে এর প্রভাব শুধু ইরান যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে সতর্ক করেন ডসন।
এতে ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী কীভাবে তাদের সেনা ও সরঞ্জাম সাজাবে, সামরিক সম্পদ কীভাবে বণ্টন করবে, কীভাবে যুদ্ধ সক্ষমতা তৈরি করবে এবং বিদেশে কীভাবে অভিযান চালিয়ে যাবে’—এসব বিষয়ও প্রভাবিত হবে।
সূত্র: আলজাজিরা





