রিফর্ম ইউকেকে ৩৬ মিলিয়ন পাউন্ড দিচ্ছেন ব্রিটিশ ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়ার

ছবি: রয়টার্স
ব্রিটেনের রাজনীতিতে বড় চমক। দেশটির রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকে পাচ্ছে রেকর্ড ৩ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডের অনুদান। এই বিপুল অর্থ দিচ্ছেন ব্রিটিশ ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়ার বেন ডেলো। দেশটির কোনো রাজনৈতিক দলকে দেওয়া একক অনুদানের ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ রেকর্ড।
ডেইলি টেলিগ্রাফে লেখা এক নিবন্ধে বেন ডেলো জানিয়েছেন, একটি ন্যায্য লড়াই ও সমান সুযোগের পরিবেশ চাওয়া থেকেই এই অর্থ দিচ্ছেন তিনি।
ডেলো জানান, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত প্রতি মাসে ১০ লাখ পাউন্ড করে রিফর্ম ইউকেকে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। তবে ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক অনুদানে সীমা আসতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি। তাই পুরো অর্থ একবারেই দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী দাতারা রাজনৈতিক দলকে কত টাকা অনুদান দিতে পারবেন, তার কোনো নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নেই। তবে লেবার পার্টি এর আগে বিদেশে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের অনুদানের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ পাউন্ড করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
শেফিল্ডে জন্ম নেওয়া বেন ডেলো এরই মধ্যে রিফর্ম ইউকেকে ৪০ লাখ পাউন্ড অনুদান দিয়েছেন। দলটির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে হংকং থেকে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার কথাও এর আগে জানিয়েছিলেন তিনি।
গত বছর ব্যাংক সিক্রেসি অ্যাক্ট লঙ্ঘনের ঘটনায় ডেলোকে নিঃশর্ত ক্ষমা করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
টেলিগ্রাফে ডেলো লিখেছেন, ‘কেউ কেউ গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে তারা এটিকে একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান। তিনি এমনটা চান না। তার লক্ষ্য ন্যায্য লড়াই ও সবার জন্য সমান সুযোগ।’
তিনি আরও লিখেছেন, রিফর্মের সাম্প্রতিক সমস্যাগুলো থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন। সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অর্থ সংগ্রহে কম সময় দেওয়া উচিত। বরং সরকার পরিচালনার প্রস্তুতিতে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার।
এদিকে রিফর্ম ইউকের অর্থ সংগ্রহ নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। গত সপ্তাহে চ্যানেল ফোর নিউজের একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর এই তদন্ত শুরু হয়। দলটি বিদেশি অর্থায়নের আইন ভেঙেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছে রিফর্ম ইউকে। তদন্তে সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে দলটি।
রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ ডেলোর অনুদানকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এই উপহারে তিনি সম্মানিত ও বিনীত বোধ করছেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে থাইল্যান্ডভিত্তিক ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগকারী ক্রিস্টোফার হারবর্নের কাছ থেকে ৫০ লাখ পাউন্ডের উপহার পেয়েছিলেন ফারাজ। এই উপহার ঘোষণা করা উচিত ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনার বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
তবে ফারাজের দাবি, উপহারটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। তার সংসদীয় বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাই এটি নিবন্ধন করার কোনো বাধ্যবাধকতা তার ছিল না।
গত নির্বাচনের আগে রিফর্ম ইউকেকে দেওয়া অর্থ রাজনৈতিক অনুদানসংক্রান্ত আইন মেনে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও তদন্ত করছে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ।
এই তদন্তের আওতায় রয়েছে ফারাজের দীর্ঘদিনের সহযোগী জর্জ কটরেলের মা ফিওনা কটরেলের সরাসরি দেওয়া অনুদান। পাশাপাশি রিফর্ম ইউকের ডেপুটি নেতা রিচার্ড টিসের নিয়ন্ত্রিত একটি কোম্পানির মাধ্যমে দেওয়া অর্থও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুনে ওই কোম্পানি ফিওনা কটরেলের কাছ থেকে ১০ লাখ পাউন্ড পেয়েছিল।
বিদেশে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের রাজনৈতিক অনুদানে সীমা আরোপের উদ্যোগ নিয়ে রিফর্ম ইউকে ও দলটির প্রধান দাতাদের সঙ্গে সরকারের তীব্র বিরোধ চলছে। দলটির অভিযোগ, লেবার সরকার তাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
সরকার আরও একটি উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন একটি বিলও আনার চেষ্টা চলছে। এতে বিদেশে থাকা ব্রিটিশ ভোটারদের অনুদানে সীমা নির্ধারণ করা হবে। যুক্তরাজ্যে ফেরার পর এক বছরের মধ্যে তারা কোনো রাজনৈতিক দলকে ১ লাখ পাউন্ডের বেশি দিতে পারবেন না। ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল বিল’ নামে এই প্রস্তাবের দ্বিতীয় দফা আলোচনা আগামী সোমবার হাউস অব লর্ডসে হওয়ার কথা।
গত বছর ক্রিস্টোফার হারবর্ন রিফর্ম ইউকেকে একবারে ৯০ লাখ পাউন্ড অনুদান দিয়েছিলেন। সে সময় জীবিত কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে যুক্তরাজ্যের কোনো রাজনৈতিক দল পাওয়া সবচেয়ে বড় একক অনুদান ছিল এটি। এর আগে কনজারভেটিভ পার্টি উত্তরাধিকারসূত্রে ১ কোটি পাউন্ড পেয়েছিল। তবে বেন ডেলোর সর্বশেষ অনুদানে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে।
ডেলোর অনুদানের প্রতিক্রিয়ায় লেবার পার্টির এক মুখপাত্র বলেছেন, ফারাজ এখনো কেলেঙ্কারিতে ডুবে আছেন। তার মুখোমুখি হওয়া প্রশ্নগুলোও কমছে না, বরং আরও বাড়ছে।
তিনি আরও বলেছেন, ‘রিফর্ম ইউকে এসব প্রশ্ন থেকে অর্থের জোরে বেরিয়ে আসতে পারবে না। দলটির বিরুদ্ধে কেলেঙ্কারি ও সন্দেহজনক অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। ফারাজ ও রিফর্মকে এসব বিষয়ে জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। পুলিশের তদন্তেও পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের প্রমাণ করতে হবে, তারা শুধু নিজেদের স্বার্থে রাজনীতিতে আসেনি।’
লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের ক্যাবিনেটদের মুখপাত্র লিসা স্মার্ট বলেছেন, ‘ফারাজ অর্থের জোরে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্পের আমেরিকাকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসতে চাইছেন।’
তিনি আরও বলেছেন, ফারাজ অর্থের জোরে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে যেতে চাইছেন। এভাবে চলতে পারে না। রাজনৈতিক অনুদানে সীমা নির্ধারণ করা উচিত। এ বিষয়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রের ওপর নির্ভর করছে।’
সূত্র: বিবিসি




