আগামীর সময়

মার্কিন-ইরান সম্পর্ক নিয়ে অবশ্যপাঠ্য ১০ বই

মার্কিন-ইরান সম্পর্ক নিয়ে অবশ্যপাঠ্য ১০ বই

সংগৃহীত ছবি

যখন থেকে ইরানিদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে পুঁজি করে আমেরিকা এবং ইজরায়েল মিলে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে— তখন থেকেই ইন্টারনেটে ও পশ্চিমা মিডিয়ায় ভুল তথ্য, অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে বৈধতা দেওয়া।

এই বিশাল অপপ্রচার অভিযানের সর্বোত্তম প্রতিষেধক হলো বিজ্ঞ এবং দায়িত্বশীল চিন্তাবিদদের লেখা বই পড়া। ফেসবুক বা এক্স (টুইটার) থেকে তথ্য না নিয়ে বই পড়ুন। এখানে ১০টি বইয়ের তালিকা দেওয়া হলো যা চিন্তায় সহায়তা দেবে, এমনকি বদলেও দিতে পারে।

১. অ্যাক্সিস অফ এম্পায়ার (Axis of Empire, ২০২৬)
লেখক: আফশিন মতিন-আসগারি

বইটি একদম সাম্প্রতিক। এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা ভেঙে দেয় যে—এক সময় আমেরিকা ও ইরানের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল এবং পরে নষ্ট হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, শুরু থেকেই আমেরিকা ইরানকে তাদের একটি সামরিক ঘাঁটি বা আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছিল, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর বাধাগ্রস্ত হয়।

২. দ্য লং ওয়ার অন ইরান (The Long War on Iran, ২০২৬)
লেখক: বেহরুজ ঘামারি

লেখক এখানে দেখিয়েছেন যে, তেহরানের ক্ষমতায় কে আছে সেটা বড় কথা নয়; আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যই হলো ইরানকে দুর্বল করে রাখা। এটি ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী 'কাঠামোগত যুদ্ধ' (স্যাংশন বা অর্থনৈতিক অবরোধ) নিয়ে আলোকপাত করে।

৩. হিরোস টু হোস্টেজ (Heroes to Hostages, ২০২৩)
লেখক: ফিরোজেহ কাশানি-সাবেত

বইটি ১৮০০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস কভার করে। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে আমেরিকা তেলের লোভে বিশ্বে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে এবং কীভাবে ইরানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়ে আসছে।

৪. দ্য ক্যু (The Coup, ২০১৩)
লেখক: এরভান্দ আব্রাহামিয়ান

এটি ১৯৫৩ সালের আগস্টে সিআইএ (CIA) এবং ব্রিটিশ এমআই-সিক্স (MI6)-এর মাধ্যমে ইরানের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার বিস্তারিত দলিল। মোসাদ্দেক ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন, যা মেনে নেয়নি পশ্চিমা শক্তিগুলো।

৫. ইরান-কন্ট্রা (Iran-Contra, ২০১৪)
লেখক: ম্যালকম বার্ন

এটি ১৯৮০-র দশকের একটি কুখ্যাত কেলেঙ্কারি। তখনও আমেরিকা প্রকাশ্যে ইরানের বিরোধী ছিল, কিন্তু প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করেন। সেই বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি মার্কিন আইন লঙ্ঘন করে নিকারাগুয়ার 'কন্ট্রা' বিদ্রোহীদের সাহায্য করেন।

৬. গেস্টস অফ দ্য আয়াতুল্লাহ (Guests of the Ayatollah, ২০০৬)
লেখক: মার্ক বাউডেন

৪ নভেম্বর ১৯৭৯ থেকে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক ৪৪৪ দিনের 'ইরান জিম্মি সংকট' নিয়ে এটি লেখা। আমেরিকার দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা এই বইটি দেখায় যে, সেই সময় মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে কতটা অজ্ঞ ছিলেন।

৭. অল দ্য শাহ’স মেন (All the Shah’s Men, ২০০৩)
লেখক: স্টিফেন কিনজার

এটিও ১৯৫৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থান নিয়ে লেখা। একজন সাংবাদিকের জবানিতে লেখা এই বইটি খুব সহজবোধ্য। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে ব্রিটেন ও আমেরিকা মিলে একটি দেশের গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছিল।

৮. প্যালেস অফ সলিটিউড (Palace of Solitude, ১৯৯২)
লেখক: সুরাইয়া এসফান্দিয়ারি বখতিয়ারি

এটি ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মজীবনী। ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের সময় তাদের পালানো এবং আমেরিকার সাহায্যে আবার ক্ষমতায় ফেরার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখানে পাওয়া যায়। এটি শাহের উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানসিকতা বুঝতে সাহায্য করে।

৯. দ্য ঈগল অ্যান্ড দ্য লায়ন (The Eagle and the Lion, ১৯৮৯)
লেখক: জেমস এ বিল

এটি ১৯৪০ থেকে ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত সম্পর্কের ইতিহাস। যদিও বইটি পুরনো, কিন্তু এটি সম্পর্কের আদি ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ১৯৫৩-এর আগের এবং পরের পরিস্থিতি বুঝতে এটি বেশ কার্যকর।

১০. দ্য স্ট্র্যাংগ্লিং অফ পারস্য (The Strangling of Persia, ১৯১২)
লেখক: ডব্লিউ মরগান শাস্টার

এটি ১৯০৫-১৯১১ সালের ইরানের সাংবিধানিক বিপ্লবের ঠিক পরের কাহিনী। মরগান শাস্টার ছিলেন একজন মার্কিন নাগরিক যিনি ইরানকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে গিয়েছিলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছিলেন কীভাবে রাশিয়া ও ব্রিটেন মিলে ইরানের স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরছিল।


এই বইগুলো পড়লে বোঝা যায় যে, ইরান ও আমেরিকার বর্তমান শত্রুতার বীজ বপন করা হয়েছিল ১৯৫৩ সালের সেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। আমেরিকা সবসময়ই চেয়েছে ইরানের তেল এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে, আর ইরান চেয়েছে নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে।

(মিডিলইস্টআই থেকে অনুদিত)

লেখক: একজন প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী। প্রফেসর, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, নিউ ইয়র্ক। তিনি তুলনামূলক সাহিত্য, বিশ্ব চলচ্চিত্র, উত্তর-উপনিবেশবাদ তত্ত্ব পড়ান। কলামিস্ট এবং সাংস্কৃতিক সমালোচক হিসেবেও পরিচিত।

    শেয়ার করুন: