নতুন বিশ্ব মানচিত্র নিয়ে কেন অস্বস্তিতে জাপান-ভারত-ইউক্রেন

ছবি: বিবিসি
বিশ্বের মানচিত্র বদলেছে জাতিসংঘ। নতুন মানচিত্রে আরও নির্ভুলভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত আয়তন। তবে এই উদ্যোগে সায় দিলেও মানচিত্রের কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ভারত, জাপান ও ইউক্রেন।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে কাশ্মীর, ক্রিমিয়া ও কুরিল দ্বীপপুঞ্জের মতো বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডের উপস্থাপন।
গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিপুল ভোটে পাস হয় বিশ্বের নতুন মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার একটি প্রস্তাব। এতে ১৬৪টি দেশ পক্ষে ভোট দিয়েছে। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। একমাত্র বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আফ্রিকান ইউনিয়নের কয়েক মাসের প্রচারের পর জাতিসংঘে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। আফ্রিকান ইউনিয়নও গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন একটি মানচিত্র নেয়।
ভোটের আগে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেন্সেভিচ প্রস্তাবটির সমালোচনা করে বলেছেন, ‘জাতিসংঘ তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে, এই প্রস্তাব তারই উদাহরণ। বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে এই সংস্থা ১৬ শতকের মানচিত্র নিয়ে আলোচনা করছে।’
প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর ভারত, ইউক্রেন ও জাপানও নতুন মানচিত্রের কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে কোনো দেশই নতুন মানচিত্র ব্যবহারের মূল উদ্যোগের বিরোধিতা করেনি। তাদের আপত্তি মূলত কিছু বিতর্কিত ভূখণ্ড মানচিত্রে কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে।
কেন নতুন বিশ্ব মানচিত্র?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ইকুয়াল আর্থ বা সমান আয়তনের বিশ্ব মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। তবে মারকেটর মানচিত্র নিষিদ্ধ করা হয়নি। কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাও নেই।
২০১৮ সালে তিন গবেষক সমান বিশ্ব মানচিত্রে দেখানোর পদ্ধতি বা প্রজেকশন তৈরি করেন। এতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত আয়তন অনেকটা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর তার মানচিত্র তৈরি করেন। গোলাকার পৃথিবীকে সমতল কাগজে দেখানোর কারণে এতে আয়তনের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। বিশেষ করে মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি দেশগুলো বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়।
দীর্ঘদিন ধরে মানচিত্র বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, মারকেটর প্রজেকশনে আফ্রিকা ও অন্যান্য উন্নয়নশীল অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন অনেকটা ছোট দেখানো হয়। বিপরীতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে বড় মনে হয়।
যেমন, মারকেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় আফ্রিকার সমান দেখানো হয়। অথচ বাস্তবে আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বেশি। একইভাবে ইউরোপকে দক্ষিণ আমেরিকার চেয়ে বড় দেখানো হলেও বাস্তবে ইউরোপের আয়তন দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় অর্ধেক।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে এই বৈষম্যের সমালোচনা করে আসছেন। তাদের মতে, আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন ছোট করে দেখানোয় মহাদেশটি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও তৈরি হয়। এ কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে সমান আয়তনভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহারের দাবি জানিয়ে আসছেন।
তবে নতুন মানচিত্র নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক।
ইউক্রেনের আপত্তি কোথায়?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোটদানে বিরত থাকা ছয়টি দেশের একটি ইউক্রেন। অন্য পাঁচটি দেশ হলো এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া ও লিথুয়ানিয়া। দেশগুলো ইউক্রেনের অবস্থানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ভোটদানে বিরত থাকে।
ইউক্রেনের অভিযোগ, ইকুয়াল আর্থ মানচিত্রে রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে মূল ইউক্রেনের তুলনায় আলাদা ও অপেক্ষাকৃত হালকা রঙে দেখানো হয়েছে।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে এবং পরে তা নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। জাতিসংঘ এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে।
নতুন মানচিত্রে ক্রিমিয়াকে মূল রাশিয়ার ভূখণ্ড থেকেও আলাদা রঙে দেখানো হয়েছে। তবে এর হলুদাভ রঙ ইউক্রেনের তুলনায় রাশিয়ার ব্যবহৃত রঙের কাছাকাছি।
জাতিসংঘে ইউক্রেনের স্থায়ী প্রতিনিধি আন্দ্রি মেলনিক জানিয়েছেন, নতুন মানচিত্রের মূল উদ্দেশ্যের বিরোধিতা করছে না কিয়েভ। তবে মানচিত্রে সংশোধনের অনুরোধ করেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
তার দাবি, নতুন মানচিত্রটি ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন ভূখণ্ডের উপস্থাপনা নিয়ে অপব্যবহার ও বিকৃতির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
জাপানের দাবি কী?
জাপানও নতুন মানচিত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে মানচিত্রের কিছু উপস্থাপনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। দেশটির অভিযোগ, রাশিয়ার ভূখণ্ড এবং বিরোধপূর্ণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জকে একই ধরনের রঙ ও ছায়ায় দেখানো হয়েছে।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জের চারটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। রাশিয়ায় এগুলো দক্ষিণ কুরিল এবং জাপানে উত্তরাঞ্চলীয় ভূখণ্ড নামে পরিচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বীপগুলো দখল করে নেয়। পরে সেখানকার জাপানি বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব দ্বীপ মূল চুক্তির আওতায় ছিল না। বর্তমানে দ্বীপগুলো রাশিয়ার প্রশাসনের অধীনে রয়েছে।
চলতি বছরের আগস্টে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রথমবারের মতো বিরোধপূর্ণ দ্বীপগুলো সফর করেন। এতে জাপান তীব্র প্রতিবাদ জানায়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সফরটিকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।
এ সপ্তাহে জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত জাপানি দূতাবাস ইকুয়াল আর্থের নির্মাতাদের মানচিত্রে সংশোধন আনার অনুরোধ জানিয়েছে।
তিনি বলেছেন, মানচিত্রে জাপান সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু উপস্থাপনা রয়েছে। দেশের ভূখণ্ড ও ভৌগোলিক নাম নিয়ে ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো প্রয়োজন।
ভারতের উদ্বেগ কোথায়?
ভারতও জাতিসংঘে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে রবিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিতর্কিত কাশ্মীর অঞ্চলের উপস্থাপনা নিয়ে একটি সতর্কতা জানিয়েছে।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। পরে অঞ্চলটি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে এবং এ নিয়ে একাধিক যুদ্ধও হয়েছে।
কাশ্মীরের কিছু অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে, কিছু অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে। আবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি অংশ নিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনেরও বিরোধ রয়েছে। ওই অংশ চীনের প্রশাসনের অধীনে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, জাতিসংঘের ভোটে মূলত সমান আয়তনের মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করা হয়েছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট মানচিত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি।
তিনি বলেছেন, ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ড, যার মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলও রয়েছে, ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ীই দেখাতে হবে। কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন ভারত মেনে নেবে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটির সরাসরি বিরোধিতা করেছে। দেশটির প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেন্সভিচ দাবি করেছেন, বাস্তব সমস্যার বদলে ১৬ শতকের মানচিত্র নিয়ে আলোচনা করে জাতিসংঘ নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গোলাকার পৃথিবীকে সমতল মানচিত্রে পুরোপুরি নির্ভুলভাবে দেখানো সম্ভব নয়। তবে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে তুলে ধরে। জাতিসংঘের প্রস্তাব তাই মানচিত্রের চেহারা বদলের পাশাপাশি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক উপস্থাপন নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা



