এআই দিয়ে বাড়ির কাজে নম্বর বাড়ছে ঠিকই, তবে পরীক্ষায় লবডঙ্কা

ক্লাসরুমে কয়েকজন চীনা শিক্ষার্থী। ফাইল ছবি / রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বদলে দিচ্ছে পড়াশোনার ধরন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে পড়াশোনায় থাকা বিশ্বের কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর সামনে এখন এআই ব্যবহারের সুযোগ। এআই দিয়ে সেকেন্ডেরও কম সময়ে হয়ে যাচ্ছে জটিল সব কাজ।
এ বিষয়টি ভাবাচ্ছে শিক্ষক, অভিভাবক ও গবেষকদের। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এআই চ্যাটবট যদি কয়েক সেকেন্ডেই হোমওয়ার্ক করে দিতে পারে, তাহলে হোমওয়ার্কের আসল উদ্দেশ্য কী?
চীন এআই শিক্ষায় দ্রুত এগিয়েছে। দেশটিতে বছরে অন্তত আট ঘণ্টা এআই শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারও পাঠ্যক্রমে এআই যুক্ত করতে শুরু করেছে।
এআই চ্যাটবট পড়াশোনাকে দ্রুত ও সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থী যখন এআই সরিয়ে রেখে পরীক্ষার হলে বসে, তখন কী হয়?
তখনই আসল প্রশ্ন সামনে আসে—শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখল , আর শিখার কতটা যন্ত্রের কাছেই থেকে গেল?
হোমওয়ার্ক বাড়ছে, শেখা কমছে
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বড় একটি গবেষণা করেছেন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড স্ট্রমবার্গ এবং হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিক্টর লেই ও ইয়ানহুই উ।
তারা চীনের ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীকে ৩০ মাস ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
গবেষণায় নয়টি বিষয়ের হোমওয়ার্ক, মাসিক বই না দেখে দেওয়া পরীক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফল বেশ চমকপ্রদ।
এআই ব্যবহারের পর শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কের নম্বর বেড়েছে ১৮ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রতিটি হোমওয়ার্ক করতে সময় কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। আগে যেখানে গড়ে ৬৪ মিনিট লাগত, সেখানে সময় নেমে এসেছে ৪৫ মিনিটে।
কিন্তু পরীক্ষার হলে এআই ছিল না।
ছয় মাসের মধ্যেই মাসিক পরীক্ষায় তাদের নম্বর কমেছে ২০ শতাংশ। গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষাতেও ফল খারাপ হয়েছে। সেখানে পুরো প্রভাবটি আরও দীর্ঘ সময়ে স্পষ্ট হয়েছে।
অর্থাৎ হোমওয়ার্ক ভালো হয়েছে। সময়ও বেঁচেছে। কিন্তু শেখা কতটা হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুব একটা ভালো নয়।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।
ওইসিডির ২০২৬ সালের ডিজিটাল এডুকেশন আউটলুকে বলা হয়েছে, এআই যদি শেখানোর জন্য তৈরি না হয় বা নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতিতে ব্যবহার না করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাজের ফল ভালো হতে পারে। কিন্তু তাতে প্রকৃত শেখার উন্নতি নাও হতে পারে।
গবেষক দ্রাগান গাশেভিচ ও তার সহলেখকেরা শেখার সময় প্রয়োজনীয় চিন্তার পরিশ্রম কমে যাওয়ার এই প্রবণতাকে বলেছেন ‘মেটাকগনিটিভ অলসতা’।
সহজ কথায়, শিক্ষার্থী নিজে চিন্তা না করে কাজটি এআইকে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে।
এআই কীভাবে ব্যবহার করছে শিক্ষার্থীরা
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সামনে এসেছে।
শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করছে কি না, শুধু সেটিই বিষয় নয়। কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভোডাফোন ফাউন্ডেশনের জন্য ইপসোসের করা এক জরিপে ইউরোপের সাতটি দেশের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার শিক্ষার্থীর মত নেওয়া হয়েছে।
তাদের ৫৬ শতাংশ বলেছেন, পড়াশোনার সময় এআই দিয়ে তথ্য খোঁজেন।
৪৫ শতাংশ এআই ব্যবহার করেন বিভিন্ন শব্দ ও বিষয় বুঝতে।
কিন্তু ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা কাজের পুরো সমাধান পেতে এআই ব্যবহার করেন।
স্বাধীনভাবে শেখার কাজে এআই ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম।
২৯ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের শেখার পথ দেখাতে এআইয়ের ইন্টার্যাকটিভ বা প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে যায় এমন কনটেন্ট ব্যবহার করেন।
মাত্র ২০ শতাংশ এআই দিয়ে নিজেদের জন্য আলাদা পড়াশোনার পরিকল্পনা তৈরি করেন এবং অগ্রগতি অনুসরণ করেন।
অর্থাৎ এআইকে শিক্ষক বা সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করার বদলে অনেকে সেটিকে কাজ করে দেওয়ার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।
শুধু পড়াশোনা নয়, বদলাচ্ছে শিক্ষার্থীদের জীবনও
এআই এখন শুধু হোমওয়ার্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থীদের জীবনের আরও বড় অংশে ঢুকে পড়ছে এটি।
তাৎক্ষণিক সাহায্য থেকে শুরু করে কারও সঙ্গে কথা বলা—সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যের ১ হাজার ৫৪ জন পূর্ণকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর করা ২০২৬ সালের এইচইপিআই-কোর্টেক্স জরিপে ৪৯ শতাংশ বলেছেন, এআই তাদের শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা উন্নত করেছে।
তাদের মতে, এআই সময় বাঁচায়। কঠিন বিষয় বুঝতে সাহায্য করে। প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সহায়তাও দেয়।
তবে এর আরেকটি দিকও আছে—একাকিত্ব। এই জরিপে প্রথমবার শিক্ষার্থীদের একাকিত্বের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।
৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, এআই তাদের একাকিত্বে কোনো পরিবর্তন আনেনি।
বাকিদের মধ্যে ২১ শতাংশ বলেছেন, এআই ব্যবহারে তারা কম একাকী বোধ করেন। বিপরীতে ২০ শতাংশ বলেছেন, তারা আরও বেশি একাকী বোধ করেন।
আসল ঝুঁকি কোথায়
এআই শিক্ষার্থীদের কাজ সহজ করে দিচ্ছে। সময় বাঁচাচ্ছে। দ্রুত উত্তর দিচ্ছে। কঠিন বিষয় বুঝতেও সাহায্য করছে।
কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় বিপদ। কাজ করে দেওয়া আর শেখানো এক বিষয় নয়।
একজন শিক্ষার্থী এআইয়ের সাহায্যে নিখুঁত হোমওয়ার্ক জমা দিতে পারে। কিন্তু পরীক্ষার হলে যদি তাকে একাই উত্তর দিতে হয়, তখন তার নিজের শেখাটা কতটা কাজে আসবে?
চীনের গবেষণার ফল সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।
এআই তাই শিক্ষার শত্রু—এমনটা বলা যাচ্ছে না। আবার এটিকে শুধু সময় বাঁচানোর যন্ত্র হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই।
এআই শিক্ষার্থীর হয়ে কাজ করবে, নাকি শিক্ষার্থীকে কাজটি শেখাবে—ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় মূল লড়াইটা সম্ভবত এখানেই।
সূত্র : আলজাজিরা





