পেটে টান পথে জনতা, ক্ষোভে জ্বলছে ইউরোপ
- গ্রিসে ধর্মঘটের ডাক শিক্ষকদের
- ইতালিতে সেনা মোতায়েনের উদ্যোগ
- স্পেন-পর্তুগালে তাঁবু গেড়ে বিক্ষোভ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক টুকরো রুটি। ক্ষুধার্ত বোনের সন্তানদের মুখে তুলে দিতে তা চুরি করেছিলেন জাঁ ভালজাঁ। ফরাসি সাহিত্যিক ভিক্টর হুগোর কালজয়ী উপন্যাস ‘লে মিজেরাবল’-এর সেই চরিত্র আজও মনে করিয়ে দেয়, ক্ষুধা শুধু পেটের নয়, সমাজের বিবেকেরও পরীক্ষা। প্রায় পৌনে দুই শতাব্দী পর ইউরোপের রাজপথে যেন ফিরে এসেছে জীবিকার সে প্রশ্ন। কোথাও জ্বালানি কেনার সামর্থ্য নেই, কোথাও মজুরি দিয়ে মেটে না বাড়িভাড়া। কোথাও শিক্ষার খরচ মেটাতে হিমশিম পরিবার। প্যারিসে পোড়া গাড়ির কঙ্কাল। মিলানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ। মাদ্রিদ থেকে লিসবন, চত্বর জুড়ে প্রতিবাদীদের তাঁবু। ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে পুরো ইউরোপ। এক দেশ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে আরেক দেশে।
এককথায় বললে, এবার পেটে টান পড়েছে ইউরোপে; তাই জোট বেঁধে পথে নেমেছে জনতা।
গতকাল মঙ্গলবার রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ফরাসি দৈনিক ল্য মোঁদ ও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইউরোপের এই অস্থির চিত্র। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়া পুড়ছে বিক্ষোভের আগুনে। গ্রিসেও নতুন কর্মসূচিতে নামছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তবে সব আন্দোলনের ধরন আবার এক নয়। কোথাও মারমুখী, কোথাও শান্তিপূর্ণ অবস্থান। আবার কোথাও সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ফ্রান্সে। গত শনিবার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থার প্রতিবাদে পথে নামেন প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। অধিকাংশ সমাবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও সহিংসতা ছড়ায় রাজধানী প্যারিস, মার্সেই ও লিয়ঁতে। পোড়ানো হয় গাড়ি, ভাঙচুর করা হয় দোকানপাট, জমে ওঠে লুটতরাজ। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক নগর ভবনও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি সামালে দেশ জুড়ে প্রায় আড়াই হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর পর্যন্ত কারাগারে পাঠানো হয়েছে ১৪৯ জনকে।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ফরাসি বাণিজ্য সংগঠনের হিসাবে অন্তত দুই হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাবে আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও বেশি, প্রায় তিন হাজার। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সুদবিহীন ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে প্যারিসের রাস্তায় ফিরছেন সাধারণ মানুষ। ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। তবে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা কাটেনি।
সহিংসতা ঠেকাতে প্যারিসে সোমবার রাত ১১টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর ছিল। অন্য কয়েকটি শহরেও স্থানীয়ভাবে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। বেলা বাড়তেই দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর জানালেন, নির্দিষ্ট এলাকায় কারফিউ গত রাতের শান্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। পরিস্থিতি দাবি করলে আরও এলাকায় কারফিউ দেওয়া হবে। তবে আন্দোলনকারীদের একাংশ আগামী শনিবার ফের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। সহিংসতার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ পদত্যাগ করতে চাইলেও তা গ্রহণ করেননি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ।
অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে ইতালির রাজপথও। ফ্রান্সের মতো একই অভিযোগ সে দেশেও। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, আবাসন সংকট এবং নিম্নমানের সরকারি পরিষেবা। ঢিমেতালে হলেও চলছে সপ্তাহ জুড়েই। রাজধানী মিলানে শান্তিপূর্ণ মিছিলের পর সংঘর্ষে জড়ায় বিক্ষোভকারীদের একাংশ। ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় দোকানে। গত রবিবারের ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হন ২৭১ জন। তাদের ২২০ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। যা শুরু হয় শনিবার থেকে। উত্তেজনা ছড়িয়েছে পাশের শহর তুরিন ও বোলোনিয়ায়ও। রয়টার্সের গতকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্দেহভাজনদের আটকের ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
দক্ষিণ ইতালিতে কৃষক, ট্রাকচালক ও শ্রমিকদের অবরোধে ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল। জ্বালানির চড়া দামে বিপর্যস্ত কৃষক। সিসিলির এক প্রতিবাদী ব্যানারে লেখা, ‘আমরা ফসল ফলাই, ঘরে তুলি ঋণ।’
পর্তুগালে ক্ষোভের কেন্দ্রে আবাসন সংকট। এ বিক্ষোভও ইতালির মতোই। বিক্ষোভ শনিবার থেকে একযোগে শুরু হয়েছে দেশটির বড় বড় কয়েকটি শহরে। বিক্ষোভের কারণ, তীব্র আবাসন সংকট ও বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, কম মজুরি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। গত কয়েক বছরে বাসস্থানের দাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে পর্তুগালে।
দেশটির প্রধান শ্রমিক সংগঠন ‘পর্তুগিজ শ্রমিকদের সাধারণ কনফেডারেশন’-এর আহ্বানে শনিবার লাখো মানুষ একযোগে রাজপথে নামেন রাজধানী লিসবন, দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পোর্তো ও কোইমব্রায় শহরে। লিসবনের রসিও চত্বরে এদিন প্রায় ২০০ তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছিলেন আন্দোলনকারীরা। পোর্তোর দম জোয়াও প্রথম চত্বরে অবস্থান চলছিল প্রায় ১০ দিন। গতকাল ভোরের আগে দুই শহরেই অভিযান চালায় পুলিশ। উচ্ছেদ করা হয় প্রতিবাদীদের শিবির। গ্রেপ্তার করা হয় ৫৫ জনকে।
রয়টার্সকে আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র কারলা ভালাদাঁও বলেছেন, পুলিশের অভিযান ছিল ‘অত্যন্ত আক্রমণাত্মক’। তবে পুলিশের দাবি, অভিযান ছিল শান্তিপূর্ণ ও যথাযথ। আন্দোলনকারীদের দাবি, বাড়ি থেকে উচ্ছেদ সহজ করার এবং নতুন ভাড়াচুক্তিতে ভাড়ার সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে হবে। পর্তুগালে ২০১৭ সালের পর বাড়ি কেনার দাম দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। নতুন ভাড়াচুক্তিতে ভাড়াও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। পাশের দেশ স্পেনেও সেই একই ক্ষোভ। তীব্র আবাসন সংকট এবং বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকেই বিক্ষোভ চলছে দেশটিতে। ২ অক্টোবর ভাড়াটিয়া সুরক্ষায় জরুরি আবাসন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ পাসে ব্যর্থ হয় সরকার। বাধা দেয় ডানপন্থী দলগুলো। হওয়ার পরদিনই মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ভ্যালেন্সিয়াসহ অন্তত ৫০টি শহরে একযোগে বিক্ষোভে নামেন দেশটির হাজার হাজার মানুষ। এক দিন পরই আন্দোলনের মুখে ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তাতেও ক্ষান্ত হননি বিক্ষোভকারীরা। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেলসোল চত্বরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন প্রতিবাদীরা। ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং পরে তার মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে। বার্সেলোনাসহ অন্য শহরেও সাশ্রয়ী আবাসনের দাবি উঠেছে। বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে ধর্মঘটে নেমেছেন শিক্ষকরা। আবাসন সংস্কার ঘিরে সংসদীয় অচলাবস্থার মধ্যে নভেম্বরে আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে শিক্ষার ব্যয় ও সংস্কারের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করা হয়। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতি, বেকারত্ব ও শিক্ষার মান নিয়ে চলছে সরকারবিরোধী আন্দোলন। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগও চাইছেন বিক্ষোভকারীরা। সার্বিয়ায়ও দীর্ঘদিনের দুর্নীতিবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে আসন্ন নির্বাচনের রাজনীতিতে।
গ্রিসের এথেন্সে গতকাল শিক্ষার্থীদের সমাবেশ এবং আজ শিক্ষক ধর্মঘটের কর্মসূচি রয়েছে। দাবি কম বেতন, সাশ্রয়ী আবাসন ও শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি। আয়ারল্যান্ডেও গত সপ্তাহে বেতন বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘট করেছেন সরকারি কর্মীরা। তবে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় পরে ধর্মঘট স্থগিত করা হয়েছে।
এই অসন্তোষের পেছনে বড় কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান ঘিরে যুদ্ধের অভিঘাতে ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে। ডিজেলের দাম হয়েছে দ্বিগুণ। ইউরোপীয় কমিশনের হিসাবে, জ্বালানি ও বাণিজ্যে বিপর্যয়ের আর্থিক প্রভাব প্রায় ১০ হাজার কোটি ইউরো।
অর্থনৈতিক ক্ষোভের রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়ছে। ফ্রান্সে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম নিয়ে সরব কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মারিন ল্য পেন ও কট্টর বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ। জার্মানি ও পোল্যান্ডে জ্বালানির চড়া দাম ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। তবে সেখানে ফ্রান্সের মতো সহিংস বিক্ষোভের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। ইউরোপীয় কমিশন সহিংসতার নিন্দা করলেও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
ভিক্টর হুগোর উপন্যাসে এক টুকরো রুটি ছিল বেঁচে থাকার আর্তি। আজ ইউরোপের শহরে শহরে সেই আর্তির ভাষা বদলেছে। রুটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ, মজুরি ও শিক্ষা। পুলিশ ব্যারিকেড সরাতে পারে। প্রতিবাদীদের তাঁবুও গুটিয়ে দিতে পারে; কিন্তু মাসের শেষে হিসাব না মেলার যে ভয়, তার সামনে কারফিউ কত রাত পাহারা দেবে? আর যে ইউরোপ একদিন মানুষের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলে পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছিল, আজ তার নিজের রাজপথের আর্তি কে শুনবে?



