রুশ-মার্কিন জ্বালানি চুক্তিতে ফিনল্যান্ডজুড়ে তীব্র ক্ষোভ
- অর্থনীতি বাঁচাতে যুদ্ধ শেষের জোরালো দাবি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে উত্তর ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ডের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদী চাপের মধ্যে পড়েছে। সাথে বেড়েছে বেকারত্বের হার। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাসগিয়ার (রাশিয়ান ফেডারেশন) মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক জ্বালানি চুক্তিকে প্রতারনা বলে মনে করছেন ফিনল্যান্ডের নাগরিকরা। এমন মন্তব্যই উঠে এসেছে ফিনিশ বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফিনল্যান্ডে। যুদ্ধের আগে ফিনল্যান্ড প্রতিবেশী রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম খরচে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানি করতো। তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সম্পর্কের অবনতির পর কম খরচের জ্বালানি সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফিনল্যান্ডের সার্বিক অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে। ফিনিশ পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বেকারত্বের হার বেড়েছে। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে ফিনল্যান্ডের বেকারত্বের হার বেড়ে প্রায় ৭.৯% থেকে ৮.৪%-এর ঘরে অবস্থান করছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বেশি।
এই বিষয়ে দেশটির লুট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুসানা সামগ্রিক চিত্র তুল ধরে আগামীর সময়কে বলেছেন পরিসংখ্যান বলছে দেশে বেকারত্ব ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের সামাজিক সুবিধা দেওয়া কিংবা তাদের সহায়তায় ড্রোন চুক্তি করার সিদ্ধান্ত সরকার মানবিক ও সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে নিয়েছে, এতে আমাদের দ্বিমত ছিল না। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন ও বড় শক্তিগুলোর নিজস্ব চুক্তির খবর আমাদের বিভ্রান্ত করছে। ফিনল্যান্ডের অর্থনীতি যেভাবে ধসে পড়ছে, তাতে এখন যুদ্ধ থামানো ও নিজ দেশের বাজেট সামলানোর ওপর নজর দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
পাশাপাশি, মানবিক কারণে ইউক্রেন থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের আবাসন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা প্রদান করতে গিয়ে ফিনিশ সরকারের বাজেটে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়াতে হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ফিনিশ জনগণ সরকারের গৃহীত মানবিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো মেনে নিয়েছিল।
এ নিয়ে সমাজকর্মী তাপিও কোন রাখঢাক না রেখেই নিজের বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন, “ইউরোপজুড়ে যেভাবে সংঘাত ও সহিংসতা বাড়ছে, তাতে আমরা সাধারণ মানুষ নিরাপদ বোধ করছি না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের উপর আমরা যে আস্থা রেখেছিলাম, এখন সেই নেতাদের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ট্রাম্প ও পুতিনের এই সমঝোতার খবর যদি সত্যি হয়, তবে এটি পুরো ইউরোপকে সুরক্ষার ক্ষেত্রে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। ফিনিশ সমাজ এখন স্পষ্টভাবেই যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি ও শান্তির প্রত্যাশা করছে।”
রাশিয়ার সঙ্গে ফিনল্যান্ডের ১,৩৪০ কিলোমিটারের দীর্ঘ ভৌগোলিক সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত বন্ধ রাখা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সীমান্ত সংলগ্ন ফিনিশ শহরগুলো।
বিশেষ করে, সীমান্ত সংলগ্ন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর লাপেনরান্তা চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুদ্ধের পূর্বে এই শহরটিতে প্রতিবছর লাখ লাখ রুশ পর্যটক আসতেন এবং খুচরা ব্যবসা, পর্যটন ও স্থানীয় সেবা খাতে বিপুল রাজস্ব আয় হতো। বর্তমানে পর্যটক ও সীমান্ত বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ থাকায় লাপেনরান্তার স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে এবং বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন।
এই বিষয়ে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেছেন ফিনিশ শুল্ক বিভাগে কর্মরত হেইডি। যুদ্ধের আগে সীমান্তে পর্যটকদের যাতায়াত ছিল, ব্যবসাও ভালো চলছিল। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে আসা কম দামি জ্বালানি ও কাঁচামাল পুরো ফিনল্যান্ডের উৎপাদন খরচ কম রাখতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরাই পালটে গেছে , জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়েছে । এমন কিছুর সঙ্গে ফিনিশ সমাজ পরিচিত নয়।
অতি সম্প্রতি মার্কিন নেতৃত্ব ও রাশিয়ার মধ্যে জ্বালানি (ডিজেল আমদানি সংক্রান্ত) বিষয়ক কূটনৈতিক সমঝোতা বা চুক্তি বিষয়ক পদক্ষেপআন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ধরণের উদ্যোগ ইউরোপীয় নেতাদের পাশাপাশি ফিনল্যান্ডের সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। বিষয়টি নিয়ে সরাসরি ক্ষোভ করেছেন স্থানীয় এক গণমাধ্যম কর্মী। “ এই চুক্তি নিয়ে আলোচনার মানে হলো ইউরোপকে রাশিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয়ার সামিল।”
ফিনিশ নাগরিক ও বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য যেখানে দীর্ঘ দিন ধরে ইউরোপ অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করছে, সেখানে বড় কোনো শক্তির এমন সিদ্ধান্ত তাদের আত্মত্যাগের সঙ্গে এক ধরণের বৈপরীত্য তৈরি করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতাদের সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক শক্তির এই ধরনের সমঝোতাকে অনেকেই অসন্তোষের চোখে দেখছেন। অনেক ফিনিশ নাগরিক মনে করছেন, এতে ইউরোপের নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে ফেলার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতে কর্মরত মার্কোস মনে করেন পরিস্থিতি নাজুক , এমন অবস্থায় সরকার ও জনগণের মধ্যেও বোঝাপড়ার ঘাটতিও প্রকট,। তিনি বলেন করেনজ্বালানির দাম বাড়ায় আমাদের কারখানাগুলোতে কর্মী ছাঁটাই চলছে, কাজের সুযোগ একদম কমে গেছে। দেশের ভেতর মানুষ যখন চাকরি হারিয়ে বেকার হচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির এমন খেলা সত্যিই হতাশাজনক। এই যুদ্ধ যত দিন টানবে, আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি তত বাড়বে। ফিনল্যান্ডের উচিত এখন অবিলম্বে ইউক্রেন যুদ্ধের ইতি টানা এবং নিজেদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
অর্থনৈতিক সংকট ও বাজেট ঘাটতি সত্ত্বেও ফিনল্যান্ড সরকার ইউক্রেনের নিরাপত্তা সহায়তায় নিজেদের যুক্ত রেখেছে। সম্প্রতি ফিনল্যান্ড ইউক্রেনের সাথে ড্রোন প্রযুক্তিসহ নানা সামরিক চুক্তি সম্পাদন করেছে।
তবে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপে তৈরি হওয়া অস্থিরতা ও সংঘাতের আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ফিনিশ সমাজের বড় একটি অংশ এখন যুদ্ধ দ্রুত সমাপ্তির পক্ষে মত প্রকাশ করছেন। দেশের নাগরিক ও বিভিন্ন মহলের দাবি—দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং ফিনল্যান্ডের নিজস্ব অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলায় মনোযোগ দেওয়া জরুরি।



