ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ধর্ষণ-নির্যাতন যেন নিত্যদিনের ঘটনা
- হ্যারোগেট সেনা কলেজে ধর্ষণ ও নিপীড়নের অভিযোগ চার নারীর
- সরকারি নথিতেও একের পর এক অপরাধের হিসাব

এআই নির্মিত ছবি
দেশসেবার স্বপ্ন নিয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তারা। বয়স তখন মাত্র ১৭। কিন্তু উত্তর ইংল্যান্ডের যে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তাদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা শেখানোর কথা ছিল, সেখানেই ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও দুর্ব্যবহারের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন চার নারী।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন ওই চার প্রাক্তন প্রশিক্ষণার্থী। তাদের দাবি, ঘটনাগুলো ঘটেছিল উত্তর ইয়র্কশায়ারের হ্যারোগেটে অবস্থিত আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজে, যেখানে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সেনাবাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের পরিচয় ও সব ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তবে তাদের বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে–অপ্রাপ্তবয়স্ক সেনা প্রশিক্ষণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি কতটা সক্ষম।
নতুন নয় অভিযোগ
হ্যারোগেটের এই কলেজকে ঘিরে যৌন অপরাধ ও নির্যাতনের অভিযোগ আগেও সামনে এসেছে। নর্থ ইয়র্কশায়ার পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৭ জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে ১১টি যৌন অপরাধ এবং ১৯ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে মোট ৪৩টি অপরাধের অভিযোগ রেকর্ড করলেও কোনো ঘটনায় অভিযোগ গঠনের তথ্য দেয়নি পুলিশ।
এর আগেও ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত কলেজটিকে ঘিরে ১৩টি যৌন অপরাধের অভিযোগ পুলিশের কাছে পৌঁছেছিল। এর মধ্যে নয়টি ধর্ষণ, দুটি যৌন নিপীড়ন এবং দুটি গোপনে ব্যক্তিগত দৃশ্য ধারণের অভিযোগ।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নিজস্ব হিসাবেও উদ্বেগের ছবি। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত হ্যারোগেট কলেজে যৌন অসদাচরণ ও অপরাধের ৩৭টি অভিযোগে কিশোর প্রশিক্ষণার্থী এবং পাঁচের কম অভিযোগে স্থায়ী কর্মীদের নাম উঠে এসেছে। একই সময়ে হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগও ছিল কয়েক ডজন। তবে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রশিক্ষণার্থী আনুষ্ঠানিক সামরিক অভিযোগ করেননি। অভিযোগ না থাকার এই হিসাব এবং আলাদা ব্যবস্থায় নথিভুক্ত বহু ঘটনার মধ্যে স্পষ্ট ফারাক।
মেয়েদের ঝুঁকি দশ গুণ বেশি
শিশু অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন চাইল্ড রাইটস ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্কের বিশ্লেষণে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী সেনাসদস্যদের তুলনায় ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি প্রায় দশ গুণ। ২০২১ সালে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত ২৯০ কিশোরীর মধ্যে ৩৭ জনকে যৌন অপরাধের মামলায় ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। একই সময়ে ১৬ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের মধ্যে ভুক্তভোগীর হার ছিল অনেক কম।
ওই বছর শুধু হ্যারোগেট কলেজেই যৌন অপরাধের শিকার হিসেবে ২২ প্রশিক্ষণার্থীর নাম নথিভুক্ত হয়। তাঁদের অর্ধেকের বেশি ছিলেন মেয়ে। তিন অভিযুক্ত ছিলেন কলেজের কর্মী; তাঁদের একজন পরে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছয় নারী প্রশিক্ষণার্থীর সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন।
কলেজটির ২০২০ সালের নিজস্ব জরিপেও উদ্বেগজনক চিত্র। সেখানে অংশ নেওয়া ৪৮ শতাংশ মেয়ে জানিয়েছিলেন, প্রশিক্ষণের সময় তাঁরা নিপীড়ন, হয়রানি বা বৈষম্যের অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছেন। কিন্তু এমন ঘটনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলে জানিয়েছিলেন মাত্র ৩০ শতাংশ।
নির্ভরতার সম্পর্কেই বাড়তি বিপদ
হ্যারোগেটের প্রশিক্ষণার্থীদের অধিকাংশই প্রথমবারের মতো পরিবার থেকে দূরে গিয়ে কঠোর সামরিক পরিবেশে থাকেন। তাদের বয়স কম, প্রতিষ্ঠানের নিয়মের উপর নির্ভরতা বেশি এবং সহজে প্রশিক্ষণ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগও সীমিত। এই অবস্থায় প্রশিক্ষক বা জ্যেষ্ঠ সদস্যের হাতে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে বলে শিশু অধিকারকর্মীদের মত।
প্রাক্তন প্রশিক্ষণার্থীদের ভাষ্যে, কলেজে যোগ দেওয়ার সময় চুক্তি পড়া বা সিদ্ধান্তটি বুঝে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময়ও অনেকের থাকে না। প্রথম কয়েক সপ্তাহ মুঠোফোন ব্যবহার ও শিবিরের বাইরে যাওয়া সীমিত থাকে, ফলে পরিবার বা বাইরের সহায়তা চাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
যুক্তরাজ্য সেই অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যেখানে ১৬ বছর বয়স থেকেই সশস্ত্র বাহিনীতে সদস্য নেওয়া হয়। হ্যারোগেটের আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজই মূলত এই অপ্রাপ্তবয়স্ক সেনা প্রশিক্ষণার্থীদের প্রধান কেন্দ্র। শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, প্রশিক্ষণার্থীরা আইনের চোখে শিশু; তাই তাঁদের সুরক্ষায় সাধারণ সেনাসদস্যের তুলনায় বাড়তি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সাত প্রশিক্ষককে বরখাস্ত
ব্রিটিশ সেনাবাহিনী জানিয়েছে, প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে অনুপযুক্ত সম্পর্কের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি রয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে এমন অভিযোগের পর সাত প্রশিক্ষককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এত অভিযোগ ও দণ্ডের পরও একই প্রতিষ্ঠানে নতুন ঘটনা কেন ঘটছে। ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে কয়েক বছরের মধ্যে কলেজটির ছয় কর্মী এবং এক প্রশিক্ষণার্থী শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন বলে সংসদীয় কমিটিতে জমা দেওয়া নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে শূন্য সহনশীলতা নীতি চালুর পরও।
সেনাবাহিনীর বক্তব্য, যৌন অপরাধ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান কঠোর এবং অভিযোগ উঠলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু ভুক্তভোগী ও শিশু অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ক্ষমতার কাঠামো, অভিযোগ করার ভয় এবং ঊর্ধ্বতনদের উপর নির্ভরতার কারণে বহু ঘটনা সামনে আসে না।
সেনা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাঁরা কৈশোরেই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যান, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সেনাবাহিনীর। হ্যারোগেটের চার প্রাক্তন প্রশিক্ষণার্থীর বক্তব্য তাই শুধু কয়েকটি ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অপ্রাপ্তবয়স্ক সদস্য নিয়োগ ও সুরক্ষাব্যবস্থার সামনে আরও এক কঠিন প্রশ্ন।




