‘মেড ইন ইউরোপ’ ঘিরে নতুন বিতর্ক
ইউরোপের শিল্প দুর্গে ব্রিটেনের জায়গা কোথায়?
- চীনা প্রভাব ঠেকাতে ইউরোপের শিল্প আইন, কিন্তু বাদ পড়ার আশঙ্কায় ব্রিটিশ সংস্থা
- লন্ডনের দাবি: আলোচনার টেবিলে আনতেই হবে বিষয়টি

ব্রেক্সিটের ক্ষত সারিয়ে ইউরোপের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ার স্বপ্ন দেখছিল লন্ডন। কিন্তু সেই পথেই এবার নতুন কাঁটা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ‘মেড ইন ইউরোপ’ আইন ব্রিটিশ শিল্পকে ইউরোপের বড় প্রকল্প ও ভর্তুকির বাইরে ঠেলে দিতে পারে এমন আশঙ্কায় ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পরিকল্পনাই নতুন চাপে পড়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই আইন আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকসেলারেটর অ্যাক্ট (আইএএ) নামে পরিচিত। এর লক্ষ্য হলো চীনের বাড়তে থাকা শিল্প প্রভাব কমানো এবং ইউরোপের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। কিন্তু প্রস্তাবিত নিয়মে ইইউভিত্তিক সংস্থাগুলো সরকারি চুক্তি, ভর্তুকি ও শিল্প সহায়তায় অগ্রাধিকার পেতে পারে যা ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর জন্য বড় বাধা তৈরি করতে পারে।
ব্রিটিশ সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ‘মেড ইন ইউরোপ’ আইনটি লন্ডন-ইইউর নতুন সম্পর্কের আলোচনায় অবশ্যই থাকতে হবে৷ এক কর্মকর্তা বলেছেন, “বিষয়টি আলোচনার টেবিলে তোলার দাবি জানিয়েছে ব্রিটেন।”
ব্রিটেনের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি গাড়ি শিল্প, প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক শক্তি, সবুজ হাইড্রোজেন ও রাসায়নিক শিল্প নিয়ে। কারণ এসব ক্ষেত্রে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপীয় বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শিল্প মহলের আশঙ্কা, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে ব্রিটিশ কারখানাগুলো ইউরোপীয় প্রকল্পের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে গাড়ি শিল্পে ঝুঁকি বেশি। ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের সংগঠনও আগে সতর্ক করেছে, যুক্তরাজ্যকে বাইরে রাখা হলে ইউরোপের সঙ্গে বহু দশকের সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংগঠনটির যুক্তি, ব্রিটেনে তৈরি গাড়ি, যন্ত্রাংশ ও ব্যাটারিকে ইইউভুক্ত দেশের পণ্যের মতোই বিবেচনা করা উচিত।
এই সংকট এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ব্রিটেন ও ইইউ ব্রেক্সিট-পরবর্তী সম্পর্ক ‘রিসেট’ করার চেষ্টা করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ইউরোপীয় কমিশন প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লাইয়েনের মধ্যে ২০২৫ সালের মে মাসে যে পরিকল্পনা হয়েছিল, সেখানে এই আইনটি ছিল না। পরে নির্ধারিত শীর্ষ বৈঠকও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে পিছিয়ে যায়।
তবে ইইউর ভেতরেও ব্রিটেনকে পুরোপুরি বাইরে রাখার বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পক্ষে থাকলেও ফ্রান্স তুলনামূলক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে গার্ডিয়ান জানিয়েছে।
এদিকে কানাডার সঙ্গে ইইউর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগও ব্রিটেনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অটোয়ার সম্ভাব্য বিশেষ অংশীদারিত্বের আলোচনার মধ্যে লন্ডনের আশঙ্কা, ইউরোপের কৌশলগত অগ্রাধিকারে ব্রিটেনের গুরুত্ব কমে যেতে পারে।
ব্রিটিশ সরকারের জন্য এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ, একদিকে চীনা শিল্প প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা, অন্যদিকে নিজেদের শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ইউরোপীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হতে দেওয়া। ‘মেড ইন ইউরোপ’ আইন তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক নিয়ম নয়; এটি ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেন-ইইউ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পরীক্ষার নতুন অধ্যায় হয়ে উঠেছে।



