ফ্রান্সে প্রবৃদ্ধির পথ রুদ্ধ, মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র

প্যারিসের এক বেকারির কাঁচের বাইরে চিন্তিত নাগরিক; মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপ ও স্থবির প্রবৃদ্ধির প্রতীকী দৃশ্য।
প্রবৃদ্ধির গতি থমকে গেছে। অন্যদিকে আবারও ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি। এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘদিনের উচ্চ সরকারি বাজেট ঘাটতি। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এসে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পড়েছে ফ্রান্স। সামনে ২০২৭ সালের বাজেট। ঘাটতি কমাতে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং একই সঙ্গে দুর্বল অর্থনীতিকে সচল রাখার চ্যালেঞ্জ এখন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রান্সের জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা INSEE এর ২৮ আগস্ট প্রকাশিত সংশোধিত হিসাবে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি আগের প্রান্তিকের তুলনায় শূন্য শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে দেশটির অর্থনীতি কার্যত স্থবির ছিল। এর আগে প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ০.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে প্রথম প্রান্তিকের জিডিপি সংকোচনের হিসাবও ০.২ শতাংশ করা হয়েছে।
অর্থনীতির স্থবিরতার প্রভাব পড়ছে মানুষের আর্থিক অবস্থাতেও। ইনসে (ফ্রান্সের সরকারি পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান) এর হিসাবে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ফরাসি পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ০.৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বেতনভুক্ত কর্মসংস্থানও ০.১ শতাংশ কমেছে। ফলে ভোক্তা ব্যয়ে কিছুটা গতি থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমেনি।
তবে অর্থনীতির সব সূচকই নেতিবাচক নয়। পরিবারের ভোগব্যয় কিছুটা বেড়েছে এবং রপ্তানিতেও গতি ফিরেছে। কিন্তু ব্যবসায়িক মজুতের পরিবর্তন ও উৎপাদন খাতের দুর্বলতা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। জুনে ফ্রান্সের উৎপাদন খাতের উৎপাদন ১.১ শতাংশ কমেছে। ফলে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ
প্রবৃদ্ধি যখন প্রায় স্থবির, তখন মূল্যস্ফীতির নতুন ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইনসের প্রাথমিক হিসাবে, আগস্টে ফ্রান্সে বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়ে ২.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে এ হার ছিল ২.১ শতাংশ। আগস্টের এই হিসাব ২৮ আগস্ট প্রকাশ করা হয়েছে এবং এর চূড়ান্ত হিসাব ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশের কথা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির এই বৃদ্ধি ফরাসি পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল থাকা অবস্থায় জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর তার প্রভাব পড়ে। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ০.৬ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিষয়টি সরকারের জন্য আরও উদ্বেগের হয়ে উঠেছে।
শ্রমবাজারেও স্বস্তির পুরো চিত্র নেই। দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেতনভুক্ত কর্মসংস্থান ০.১ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বেকারত্বের হার বেড়ে ৮.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি কর্মসংস্থান নিয়েও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাজেট ঘাটতিই বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতির দুর্বলতার পাশাপাশি ফরাসি সরকারের সামনে বড় চাপ হয়ে রয়েছে সরকারি বাজেট ঘাটতি। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত ৩ শতাংশ সীমার ওপরে রয়েছে ফ্রান্সের সরকারি ঘাটতি। ফলে সরকারকে একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় কমানো, ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
কিন্তু প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে কর ও অন্যান্য সরকারি রাজস্ব আদায়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন, সরকারি সেবা এবং সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের মতো খাতে ব্যয় কমানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন। ফলে ঘাটতি কমানোর পথ সরকারের জন্য ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
২০২৭ সালের বাজেট ঘিরে রাজনৈতিক পরীক্ষা
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে আসছে ২০২৭ সালের বাজেট। সরকারি অর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা নিতে হচ্ছে সরকারকে। কিন্তু পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বাজেট অনুমোদনের রাজনৈতিক সমীকরণও কঠিন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। করনীতি, সরকারি ব্যয়, পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাজনৈতিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে সরকারকে।
অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে কঠিন সমীকরণ হলো, সরকার যদি দ্রুত ব্যয় কমায় তাহলে দুর্বল অর্থনীতিতে চাহিদা আরও কমে গিয়ে প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আবার ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ শিথিল হলে সরকারি ঋণ ও অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফ্রান্সের সামনে তাই এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে অর্থনীতিতে আবার প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা, অন্যদিকে সরকারি অর্থব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে শূন্য প্রবৃদ্ধি, আগস্টে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি এবং উচ্চ বাজেট ঘাটতি দেখিয়ে দিচ্ছে, আগামী কয়েক মাস ফরাসি সরকারের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুই দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।







